দেশের মোট পানির মাত্র ২ শতাংশ ব্যবহার করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। আর দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর যত মিষ্টি পানির উন্মুক্ত উৎস আছে, তার ৭০ শতাংশই শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া বর্জ্যের কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে। এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উন্মুক্ত পানি বাদ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলের পানির ব্যবহার নিয়ে করা ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান অরুপ এই তথ্য পেয়েছে।
অরুপের ওই গবেষণার ফলাফলকে নিয়ে পরিবেশ-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ডব্লিউডব্লিউএফ ও তৈরি পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এইচএনএম গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পানিসম্পদের সুশাসন নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে তারা বলেছে, শিল্পকারখানাগুলোয় বর্তমান পানি ব্যবহারের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু ঢাকা নগরের পানির চাহিদা আড়াই গুণ বাড়বে। এতে বাংলাদেশ সরকারকে পানি ব্যবস্থাপনা বাবদ বছরে খরচ করতে হবে ৭০০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ওই গবেষণাটি মাঠপর্যায়ে সম্পন্ন করেছে। ওই দুটি সংস্থা বাংলাদেশের পানি খাতের অর্থনৈতিক দিক এবং সুশাসন নিয়ে গবেষণাটি করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলা অঞ্চলে সভ্যতার উদ্ভব হয়েছে নদী ও পানির কারণে। এখানে শিল্প ও ব্যবসাও নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। অথচ ওই নদীগুলো আমরা দিনে দিনে মেরে ফেলছি। টেকসই উন্নয়নের জন্য অবশ্যই দেশের পানিকে বিশুদ্ধ রাখতে হবে।’
অন্যদিকে জাতিসংঘের পানি-বিষয়ক সংস্থা ইউএন ওয়াটার বলছে, বাংলাদেশের পানির ব্যবহারের সবচেয়ে মারাত্মক দিক হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে থাকা দেশ হলেও বর্তমানে দেশের শিল্প, কৃষি ও গৃহস্থ কাজে ব্যবহৃত হওয়া পানির ৭৯ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সংস্থা দুটির গবেষণায় দেখা গেছে, এখনো বাংলাদেশের পানির সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে কৃষি খাতে, ৮৮ শতাংশ। ১০ শতাংশ পানি গৃহস্থ কাজে ব্যবহার হয় এবং মাত্র ২ শতাংশ পানি শিল্পকারখানা ব্যবহার করে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানায় এখনো বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র (ইটিপি) স্থাপন করা হয়নি। এ ছাড়া বেশির ভাগ শিল্পকারখানা নদী ও জলাশয়ের তীরে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে পানির ব্যবহার কম করা সত্ত্বেও তারা সবচেয়ে বেশি পানি দূষণ করে।
আজ বিশ্ব পানি দিবস: আজ বিশ্ব পানি দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জল ও জীবিকা, পরিষ্কার পানি-বেশি কর্মসংস্থান’। প্রতিপাদ্য দিবসের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতিসংঘ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ১৫০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান পানির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। পানি যদি বিশুদ্ধ থাকে তাহলে আরও বেশি পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, দূষিত পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর বিশ্বে ২০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। ফলে পানি বিশুদ্ধ রাখলে মানুষের মৃত্যু কমে, কর্মসংস্থানও বাড়ে।
পানি দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন থেকে ঢাকার চারপাশের চারটি নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা পানি দিবস উপলক্ষে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।