বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ডলফিনের মৃত্যু বাড়ছে

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে ১৫টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। এগুলোর মধ্যে আগস্টেই এসেছে ৯টি মৃত ডলফিন। সেপ্টেম্বরের ৯ দিনে চারটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। কক্সবাজার সৈকতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—এই পাঁচ মাসে ১৬টি ডলফিন ও ২টি তিমির মৃতদেহ ভেসে আসে। কলাপাড়া উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, গত বছরও কুয়াকাটা–সংলগ্ন উপকূলে সাত–আটটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছিল।

ডেড জোন অঞ্চলে অক্সিজেন কমে যাওয়ায় ছোট ছোট জলজ প্রাণী যেমন ছোট মাছ, চিংড়ি, শামুক, কাঁকড়াসহ অন্যান্য কাঁকড়া প্রজাতি বেড়ে উঠতে সমস্যা হবে। এদের প্রজননের জন্য এরা অন্যত্র চলে যাবে। একসময় এখানে আর এ ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে না।

সম্প্রতি কুয়াকাটায় বেশ কয়েকটি মৃত ডলফিন পাওয়ার পর ইকোফিশের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী সেখানে এগুলোর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান শুরু করেন। এসব ডলফিনের মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন তিনি। মীর মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবন–সংলগ্ন সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড থেকে সোনারচর পর্যন্ত ইরাবতী ডলফিনের বিরাট দল ঘোরাফেরা করে। এদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধানে আমরা কাজ শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, তিনটি কারণে ডলফিন মারা যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে, সাগরের ১২০ ফুট গভীরতায়ও ট্রলিংয়ের মাধ্যমে মাছ শিকার, জেলেদের জালে আটকা পড়ার পর পিটিয়ে হত্যা এবং দূষণ।’

ইরাবতী ডলফিনের আবাস বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরাবতী ডলফিনের প্রজাতি বিশ্ব থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র সাত হাজারটি। যেগুলোর প্রায় ৫ হাজার ৮০০টিই বাংলাদেশে। বিশ্বজুড়ে বিপন্ন হয়ে পড়া ইরাবতী ডলফিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের কোথাও ২০০টির বেশি এই প্রজাতির ডলফিন একসঙ্গে দেখা যায় না। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এর কারণ, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার নদীগুলোতে রয়েছে নোনা ও মিঠাপানির অনুকূল ভারসাম্য।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের তিনটি নদীর ৪৭ কিলোমিটার নৌপথকে ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর, সোয়াচ-অফ-নো-গ্রাউন্ডের উত্তর প্রান্ত ঘিরে ১ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ডলফিন, তিমি, কচ্ছপ, হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ সংরক্ষণের জন্য সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (এমপিএ) ঘোষণা করে।

ডলফিন গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইরাবতী ডলফিনের এত মৃত্যু খুবই ভয়াবহ বার্তা। আমরা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখেছি, অনেক ডলফিন জালে আটকা পড়ে মারা পড়েছে। কিন্তু এখন সেটা আশঙ্কার পর্যায়ে। এ ক্ষেত্রে সাগরে বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এ জন্য ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা দরকার। ইতিমধ্যে আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। এ জন্য এখনই সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

default-image

আটকা পড়ছে প্রচুর সেইলফিশ

বঙ্গোপসাগরে এক মাসের বেশি সময় ধরে ঝাঁকে ঝাঁকে সেইলফিশ ধরা পড়ছে। আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ—বাংলাদেশ প্রকল্প-২–এর গবেষকেরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, গত আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বেশ কয়েকটি নদীতে বিলুপ্তপ্রায় সেইলফিশ ধরা পড়তে দেখা গেছে। ১৫ থেকে ২৬ আগস্টের মধ্যে কক্সবাজার বিএফডিসি ঘাটে ১২ হাজার ৪৪১ কেজি মাছ বিক্রি করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ৪০টি সেইলফিশ জেলেরা এ ঘাটে নিয়ে আসেন এবং এর ওজন সর্বনিম্ন ১০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত।

ইকোফিশের এই পর্যবেক্ষণের সত্যতা পাওয়া যায় উপকূলের অন্যান্য মৎস্যবন্দরেও। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দর পাথরঘাটার বিএফডিসি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে গত আগস্টের শুরু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি করে সেইলফিশ আসছে। গত ২৬ আগস্ট পটুয়াখালীর মহিপুরের জেলেদের জালে ধরা পড়ে ৮টি সেইলফিশ।

পাথরঘাটার সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের মাঝি সিদ্দিক জমাদ্দারের বয়স ৫৫ বছর। তিনি ৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরেন। তিনি জানান, আগে সাগরে এই মাছ এক–দুটি ধরা পড়ত। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় ইলিশ না পেলেও জাল ফেললেই বড় বড় সেইলফিশ পাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০০ সালে সেইলফিশকে লাল তালিকাভুক্ত করে। মূলত তীর থেকে সমুদ্রের ৫০ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যেই এদের বাস। এরা খুব গভীর জলের মাছ না হলেও ৯১৫ মিটার পানির নিচ পর্যন্ত চলাচল করে। মাঝে মাঝে তীরের কাছাকাছি এলেও কখনো এরা নদীতে প্রবেশ করে না। ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে সেইলফিশ। দ্রুতগতির মাছ সেইলফিশ এ দেশে ‘পাখি মাছ’ নামে বেশি পরিচিত। মাছটির পেছনে থাকা বিশালাকার পাখনাই স্থানীয়দের ‘পাখি মাছ’ নামকরণে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হয়।

default-image

উজানে আসছে শাপলাপাতা মাছ

সেইলফিশের মতো সাগরের আরেক বাসিন্দা স্টিং রে প্রজাতির মাছ, যা স্থানীয়ভারে শাপলাপাতা মাছ হিসেবে পরিচিত। ৩০ আগস্ট রাতে বরিশালের ঝুনাহার নদীতে ইলিশের জালে পেঁচিয়ে ধরা পড়ে ১৩ মণের বেশি ওজনের একটি শাপলাপাতা মাছ। ২৯ আগস্ট দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে জেলের জালে ধরা পড়ে ১২ মণ ওজনের আরও একটি শাপলাপাতা মাছ।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ইকোফিশের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, বাঘ যেমন খাদ্যসংকট দেখা দিলে বন ছেড়ে লোকালয়ে আসে, তেমনি সাগরের প্রাণীরা বাস্তুতন্ত্রের সংকট হলে একইভাবে স্থানান্তরিত হতে পারে। সেইলফিশ, স্টিং রে—এরা সাগরের বাসিন্দা। সাগরে বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট উৎপীড়ন বেড়ে যাওয়ার কারণে এটা হতে পারে। আবার মোহনায় খাবারের সংস্থান বেড়ে যাওয়ার কারণেও এরা উপকূলে ছুটে আসতে পারে। এই গবেষক আরও বলেন, আগে কালেভাদ্রে দু–একটি এমন প্রজাতির মাছ নদীতে পাওয়া গেলে সেটাকে দুর্ঘটনাবশত গতিপথ পরিবর্তন মনে করা হতো। কিন্তু এখন সেটা বলার সুযোগ কমছে। এ জন্যই এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান দরকার।

চট্টগ্রাম মেরিন ফিশারিজের পরিচালক শরিফ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, সেইলফিশ অতি লবণাক্ত পানির মাছ। এটা কোনোক্রমেই মিঠাপানির নদীতে আসতে পারে না। হয়তো নদীতে আসার খবরটি অতি উৎসাহী কোনো জেলে দিয়েছে। তবে সাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে সেইল ধরা পড়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক। এটা বাস্তুতন্ত্রে কোনো বড় পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে কি না, সেটা অনুসন্ধানের ব্যাপার।

বঙ্গোপসাগরে ‘ডেড জোন’

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এ ২০১৭ সালের ৩১ জুন এ–বিষয়ক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘বে অব বেঙ্গল ডিপলেটেড ফিশ স্টকস অ্যান্ড হাগ ডেড জোন সিগন্যাল টিপিং পয়েন্ট’ শিরোনামে নিবন্ধটি লিখেছিলেন দুই জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অমিতাভ ঘোষ ও অ্যারন সাভিও লোবো।

তাঁরা ওই নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালের মে মাসে বিজ্ঞানীদের একটি বহুজাতিক দল একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে। তা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে খুব বড় একটি অক্সিজেনশূন্য এলাকার সন্ধান পেয়েছে তারা। অঞ্চলটি ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই ‘ডেড জোন’ হবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘ডেড জোন’। এখানে অক্সিজেন কমে গিয়ে সালফার ও ফসফরাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু ফাইটোপ্ল্যাংকটন এবং জুয়োপ্ল্যাংকটনের এই পরিবেশে হয়তো বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু ধীরে ধীরে অক্সিজেনের
মাত্রা আরও কমে গেলে পানিতে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে খাদ্যশৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে যাবে।

ডেড জোন অঞ্চলে অক্সিজেন কমে যাওয়ায় ছোট ছোট জলজ প্রাণী যেমন ছোট মাছ, চিংড়ি, শামুক, কাঁকড়াসহ অন্যান্য কাঁকড়া প্রজাতি বেড়ে উঠতে সমস্যা হবে। এদের প্রজননের জন্য এরা অন্যত্র চলে যাবে। একসময় এখানে আর এ ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে না।

সমুদ্রের ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি ও জলজ প্রাণী খেয়ে বড় মাছেরা বেঁচে থাকে। খাদ্যসংকটের কারণে বড় মাছগুলো খাবারের জন্য দিগ্বিদিক ছুটে চলবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডাঙার দিকে কিংবা সাগরের মোহনার নদীগুলোতে অধিক বড় আকৃতির সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাষ্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্যের দূষণ বা বর্ষার পরিবর্তন, উষ্ণায়নসহ নানা কারণে এই ডেড জোনের সৃষ্টি
হতে পারে।

সাগরের বড় মাছ ও প্রাণীরা মোহনায় চলে আসার বিষয়টি তারই প্রভাব কি না, সেটা অনুসন্ধানের সময় এসেছে। কারণ, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা করতে না পারলে দেশের মৎস্য সম্পদের সম্প্রসারণ, সুরক্ষা, বৃদ্ধি থমকে যেতে পারে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন