বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বনজীবীদের দেখা আগুন

দাসের ভারানি এলাকার আগুন নদীর স্রোতের মতো দ্রুত দৌড়াতে দেখেছিলেন সেলিম হোসেন (ছদ্মনাম)। বাগেরহাটের শরণখোলার সোনাতলা গ্রামের সেলিম জানালেন, আগুন গাছ থেকে গাছে ছড়িয়েছে, তবে নিচের স্তূপ করা পাতায় সূত্রপাত বলে গতি ছিল ভূমিতে। বাতাসে ওপরের দিকে পাতায় ছড়ালে দাবানলে রূপ পাওয়া অসম্ভব ছিল না। মশাল বা বিড়ি–সিগারেট থেকে আগুন তখনই লাগতে পারে, যখন এই জেলে মৌয়ালরা অসচেতন থাকেন। কিন্তু নিজের একমাত্র জীবিকার স্থানে কেউ অসচেতন হয় না, আর বনজীবীদের পক্ষে তা বনকে অপমানের শামিল। প্রথমত, একই জায়গায় তাঁদের আবার মধু বা মাছ সংগ্রহের জন্য আসতে হয়। দ্বিতীয়ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে বন আইনের কঠোর শাস্তি থেকে পরিত্রাণের সহায়তা তাঁদের নেই।

মে মাসের অগ্নিকাণ্ডের সময় দাসের ভারানিতে শুকনা পাতা পড়ে পচে কয়েক ইঞ্চি পুরু হয়েছিল। এখানে প্রমত্তা ভোলা নদী শুকিয়ে হারিয়েছে বন আর লোকালয়ের সীমানা। শুষ্ক মৌসুমে এই দাসের ভারানিতে জোয়ারের পানিও আর এখন ওঠে না।

সেলিম বলছিলেন, করোনার জন্য তিন মাস বন বন্ধ থাকাকালে বনজীবী অনেকের ঘরেই দুই বেলা খাবার থাকত না। কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে বনের গাঙ, খাল বা ভারানিতে গোপনে মাছ ধরতে গিয়েছেন। কয়েকটা মাছের বিনিময়ে কিনেছেন দুই কেজি চাল। বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনাও যে ঘটে না, তা নয়। তবে এ সংখ্যা অনুল্লেখযোগ্যই। বড় খালের মুখ আটকে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা বড় শিকারিদের, যারা সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের নিরাপত্তার দায় ক্ষমতাসীনদের। তাদের পুলিশও ধরে না, সেই জেলে-মৌয়ালদের হাঁড়ির গহ্বরে থাকে না হা হা করা শূন্যতা।

শরণখোলার আফজাল (ছদ্মনাম) কাজ করেন কমিউনিটি পেট্রল গ্রুপের (সিপিজি) হয়ে। বিনা বেতনের এই চাকরিসূত্রে দাসের ভারানির অগ্নিকাণ্ডের সময় টানা চার দিন উপস্থিত ছিলেন ঘটনাস্থলে। বলছিলেন, শুকনা পাতার আগুনে প্রথমে পুড়েছে মৃত গাছ। ফায়ার সার্ভিস ও বন বিভাগের কর্মীরা দ্রুত ও সময়মতো ফায়ার লাইন না করতে পারলে আগুন ছড়িয়ে যেত। কেননা জায়গাটি শুষ্ক ঝোপঝাড়ে ভর্তি। ধারেকাছে পানি নেই। পাইপ বসিয়ে বসিয়ে পানি আনতে হয়েছে বড় নদী থেকে। এই ফায়ার লাইন হচ্ছে আসলে ‘লাইন অফ ফায়ার’ (নির্দিষ্ট সীমানা খনন করে দ্রুত যেসব গাছের মাধ্যমে ছড়ায়, সেসব কেটে আগুনের কেন্দ্রস্থলকে বিচ্ছিন্ন করা)। কর্মীরা বনে পৌঁছাতে দেরি হলে কী ঘটত বলা যায় না। সব সময় তাঁরা ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারবেন, এমন প্রত্যাশাও ঠিক নয়। খবর পেয়ে মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও বাগেরহাট থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের‍ পৌঁছানো সময়সাপেক্ষ ছিল।

default-image

কাঠগড়ায় মৌয়ালেরা

আগুনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সন্দেহ থাকে মৌয়ালদের মশাল নিয়ে। মধু সংগ্রহের জন্য প্রতি মৌসুমে কয়েক দিনের জন্য বনে প্রবেশ করেন মধু গবেষক সৈয়দ মুহাম্মদ মঈনুল আনোয়ার। কয়েকটি বহর নিয়ে বনে যাওয়া মঈনুল বলছিলেন মশাল বানানো আর তা নিভিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার কথা ‘ভেতরের শুকনো পাতা বেঁধে বাইরের দিক কাঁচা পাতা দিয়ে বানানো হয় মশাল। স্থানীয় মানুষ ডাকে ‘কারু’ নামে। ভেতরের শুকনো পাতার সংখ্যা বেশি নয়। সাধারণত আগেই সেটা পুড়ে কাঁচা পাতাকে ধরতে চেষ্টা করলে তখন ধোঁয়া ছড়ায়। এই কারু একটি চাক কাটতে কাটতেই নিভে যায়। যদি অবশিষ্ট থাকেও, তাহলে তা পানি বা ভেজা মাটিতে গুঁজে নিভিয়ে দেওয়া হয়’। পূর্ব আর পশ্চিম বন বিভাগের মধু সংগ্রহের পরিমাণ জানিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে পশ্চিম সুন্দরবনে আগুন না লাগার কারণ কি শুধুই সেখানকার মাটির সিক্ততা?

পশ্চিম বন বিভাগের হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মধু সংগৃহীত হয়েছে ৩২২৭ দশমিক ৫০ কুইন্টাল, যার রাজস্ব ২৪ লাখ ২০ হাজার ৬২৫ টাকা। বিপরীতে একই সময় পূর্ব বন বিভাগ থেকে মধু সংগ্রহের পরিমাণ ১২২০ দশমিক ৫০ কুইন্টাল, যার রাজস্ব ৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। অর্থাৎ পূর্ব অপেক্ষা পশ্চিম বন বিভাগ থেকে প্রায় ৩ গুণ বেশি মধু সংগ্রহ করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মৌয়ালের সংখ্যা বেশি থাকে। কিন্তু সেখানে আগুনের ঘটনা ঘটে না।

আগুনের কারণ হিসেবে প্রতিবারই উঠে আসে জেলে, মৌয়ালদের বিড়ি-সিগারেট বা মৌমাছি তাড়াতে জ্বালানো মশাল থেকেই সবচেয়ে বেশি আগুনের সূত্রপাতের কথা। অপর দিকে বনজীবী মানুষ বলেন, তাঁরাই বন চেনেন সবচেয়ে ভালোভাবে। এসব আগুনের সঙ্গে আছে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের ঘটনা।

এ প্রশ্নের উত্তর কিছুটা স্পষ্ট হয় পূর্ব বন বিভাগের সেলিমের ব্যাখ্যায়। প্রথম আলোকে জানালেন, বনের ভেতরের মিঠাপানির বিলে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাছ চাষের দখল আছে। বন বন্ধ থাকা অবস্থায়ও তারা সেখানে মাছ চাষ করেছে এবং নিজস্ব লোক দিয়ে সেসব সংগ্রহ করেছে। সেলিম বলছিলেন, আগুনে পুড়ে মাটি লাল হয়ে যায়, আর সেই মাটি খেতে গজার, শিংজাতীয় মাছ জড়ো হয়। আবার ছোট গাছগুলো আগুনে পুড়ে গর্ত তৈরি হলে এর মধ্যে মাছ জমা হয়। তখন এক জায়গা থেকেই সহজে সংগ্রহ করা যায় অনেক টাকার মাছ।

ভাবনার ব্যাপার হচ্ছে, ২৪টি তদন্ত প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত হিসেব ১৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে অসাবধানতাবশত জেলে–মৌয়ালদের ফেলে দেওয়া আগুনই সম্ভাব্য কারণ। এই কারণের সঙ্গে ৫ বার সংযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মাছ মারার সুবিধার জন্য দুষ্কৃতকারীরা আগুন দিয়ে থাকতে পারে।

default-image

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও মানুষের অসৎ ইচ্ছা

সেই কবে রূপসাহা নামের এক বণিক কাজিবাছা আর ভৈরব নদের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে নদী পথের দূরত্ব কমিয়েছিলেন বাণিজ্যের স্বার্থে। সে খালই একসময় নদী হয়েছে রূপসা নামে। আবার রাজা প্রতাপাদিত্যের সময় যশোরে ভৈরব এক রাতের মধ্যে সম্পূর্ণ বাঁক বদলে হয়েছিল উত্তরমুখী। মনুষ্যসৃষ্টি বা প্রাকৃতিকভাবে নদীর বদলে যাওয়ার এসব গল্পই সময়ে হয়েছে রূপকথা। কিন্তু এখন কি নদির গতিমুখ পরিবর্তন নিয়ে এমন সরল গল্প হয়? এখন পরিবর্তনের ফলাফল, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, ঝড়ে কপোতাক্ষের বিশাল আকার নিয়ে মানুষকে বাস্তহীন করে দেওয়া। বন বাদার সাথে শত শত চিংড়ির ঘেরের দৃশ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে মৃত হয় নদী ও জলাধার। এখন নদীর বদল মানে বনভূমি ক্ষয় আর ধারাবাহিক বিপর্যয়। বঙ্গোপসাগরে আঁকড়ে টিকে থাকা সুন্দরবনের জন্যও যখন এ সত্যি তীব্র আকার ধারণ করে তখন বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কোন পর্যায়ে পৌঁছেছি আমরা। সুন্দরবনের আগুনের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, আর সেখানেই ভয়।

তিন দশক আগে আন্ধারমানিক থেকে দাসের ভারানি গিয়েছি নৌপথে। এই পথ পুরোপুরি শুকিয়ে যায় কয়েক বছরের মধ্যে। সম্প্রতি আবার কিছুটা খননের পর এখন ছোট নৌকা চলে।’
খসরু চৌধুরী, বাঘ গবেষক

অগ্নিসংযোগকারীর পরিচয় নিয়ে চিন্তিত নয়, ওর প্রয়োজন বাতাস। যাকে পেলে সে দ্রুত ছড়ায় আর চেনে শুকনো খড়কুটো ও পাতা। যাকে স্পর্শ করে করেই সামান্য স্ফুলিঙ্গও রূপ নিতে পারে দাবানলে। প্রতিটি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা উষ্ণায়নের ফলে সুন্দরবনের ভেতরের পরিবর্তনের দৃশ্য তাঁদের কাছেই বেশি, স্পষ্ট যাঁরা কয়েক দশক আগে ও পরের সুন্দরবনকে দেখেছেন দক্ষভাবে।

মোরেলগঞ্জের গুলিশাখালী গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মরা ভোলা নদী কয়েক বছর আগেও ছিল এক কিলোমিটারের বেশি চওড়া। নদীর ওপর দিয়ে এখন ভাটার সময় হেঁটেই যাওয়া যায় সুন্দরবনে। সোনাতলা গুচ্ছগ্রাম থেকেও সুন্দরবন এখন পায়ে চলাচলের পথ। কখনোসখনো বাঘ চলে আসে লোকালয়ে। বনসংলগ্ন বাসিন্দারা গরু–মহিষ চরাতে চলে যান বনে। বাঘও চিনে রাখে লোকালয়ের পথ। অবাধ যাতায়াত বন এবং লোকালয় উভয়ের জন্যই সমান ক্ষতির আয়োজন। মানুষের উপস্থিতিতে বন্য প্রাণী নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বিপরীতে লোকালয়ে বাঘের প্রবেশে স্থানীয় মানুষ বিপন্নতায় পড়ে আরও বিরূপ হতে শুরু করে বন্য প্রাণীর ব্যাপারে।

বাঘ গবেষক খসরু চৌধুরী বলছিলেন, ‘১৯৮৫ সালে উত্তর শেলার মৃগামারি আড়োভারানি দিয়ে ধানসাগর বন অফিস থেকে শরণখোলা বন অফিসে গিয়েছিলাম স্টিম কাটার ( এসিএফদের বোট) দিয়ে। ১০ বছর পরই আর সেখানে ভাটায় স্পিডবোটও চলে না। তিন দশক আগে আন্ধারমানিক থেকে দাসের ভারানি গিয়েছি নৌপথে। এই পথ পুরোপুরি শুকিয়ে যায় কয়েক বছরের মধ্যে। ২০০৫ সালে কিছুটা খননের পর এখন ছোট নৌকা চলে।’

মে মাসের অগ্নিকাণ্ডের সময় দাসের ভারানিতে শুকনা পাতা পড়ে পচে কয়েক ইঞ্চি পুরু হয়েছিল। এখানে প্রমত্তা ভোলা নদী শুকিয়ে হারিয়েছে বন আর লোকালয়ের সীমানা। শুষ্ক মৌসুমে এই দাসের ভারানিতে জোয়ারের পানিও আর এখন ওঠে না। ২০০৭ সালের মার্চে চাঁদপাই রেঞ্জের পচাকুড়ালিয়া বিলের আগুনের কারণ ছিল ভোলা নদীর আড়ুয়া বেড় খালটির নাব্যতা কমে জোয়ার ভাটা না হওয়া। এতে গাছের মরা ডাল, লতাপাতা জমে তৈরি হয় আগুন লাগার পরিবেশ। সুন্দরবনের আগুনের ঘটনার অধিকাংশ পূর্ব বন বিভাগে। ধানসাগর আর চাঁদপাই রেঞ্জের এ জায়গাগুলো দ্রুত নাব্যতা হারিয়ে পরিণত হয়েছে শুষ্ক অঞ্চলে। সামান্য আগুনই এখন দ্রুত ছড়ায়।

পানির প্রবাহ না থাকায় ভবিষ্যৎ অগ্নিকাণ্ডে বনকে কতখানি রক্ষা করা যাবে, তা বলা যায় না। প্রকৃতির এই চরম বৈরিতায় মানুষের হাত নেই? আছে। অপরিকল্পিত নদী খনন, অবৈধ বালু উত্তোলন আর বাঁধ-ব্যারাজ দিয়ে নদীশাসনের ফলাফল এই। এর সঙ্গে যদি সরাসরি মানুষের হস্তক্ষেপ যোগ হয়, তা কেমন ভয়ানক রূপ পেতে পারে, তা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল থেকে ধারণা করতে পারি আমরা।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন বনে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনায় ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের খবর আরও জোরদার হয়েছে। অগ্নিসংযোগকারী সন্দেহে ড. গ্যারি স্টিফেন মেনার্ড নামে ৪৭ বছর বয়সী এক শিক্ষককে আটকের রেশ না কাটতেই আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে আটক হয়েছেন আরেক নারী। এল দোরাদো কাউন্টির কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ তাহাও লেকে আগুনের ঘটনায় অগ্নিসংযোগকারী সন্দেহে আটক করেছে ৪৩ বছর বয়সী ভায়োলা লিও নামের ওই নারীকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এল দোরাদো কাউন্টির শেরিফ অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্দেহভাজন লিওর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে জামিন অযোগ্য মামলা।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কোনো প্রকার শিল্পকারখানা নির্মাণ করা যাবে না। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে অনুমোদিত ১৯০টি ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে ২৪টি প্রকল্প মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। এই শিল্পকারখানার মালিকদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিল্পকারখানা দ্রুত সরিয়ে আইন অমান্যকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়।

default-image

তদন্ত প্রতিবেদন ও পুনরাবৃত্তি

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত প্রতিটি তদন্ত কমিটিই গঠন করা হয় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে। সেখানে পরিবেশবিদ, স্থানীয় বনজীবী বা সুন্দরবন সংরক্ষণ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও উপস্থিতি প্রয়োজন কি না, তা আলোচনার দাবি রাখে।

এখন পর্যন্ত পাওয়া ২৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে ২০০২ সালে কটকা অভয়ারণ্যের জামতলা এবং ২০০৫ সালে ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজি স্টেশনের কাছের আগুনের কারণ জানা যায়নি। ২০০৬ সালের চারবারের অগ্নিকাণ্ডসহ মোট ছয়বারের ঘটনায় কোনো সুপারিশ দেওয়া হয়নি।

জীববৈচিত্র্যময় সুন্দরবনে দুই দশকের সব আগুনের ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে ২৩ লাখ ৫৩৩ টাকা। এর মধ্যে পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ হয় ধারণার মাধ্যমে। বিপন্ন জীববৈচিত্র্য বা অণুজীব ও প্রাণিজগতের ক্ষতির হিসাবের কোনো সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ প্রয়োজন। ২০০২ সালের কটকা অভয়ারণ্য এলাকায় ১০ একর জমিতে ২০টি সুন্দরীগাছ, ৩০টি গেওয়া ও সাড়ে চার শ হেঁতালগাছ পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় কোনো কারণ জানা যায়নি এবং সম্পদের হিসাব থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ নেই। ২০০৪ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনে ৯ শতক জায়গার শণ পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৩০ টাকা মাত্র। ২০০৬ সালে চাঁদপাই রেঞ্জে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ৫৫০ টাকা মাত্র। সম্পদ নষ্টের ২৩ লাখ টাকার মধ্যে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকাই হচ্ছে এ বছরের মে মাসের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ক্ষতির হিসাব।

দুই ডজন প্রতিবেদনের মধ্যে জেলে–মৌয়ালদের ফেলে আসা আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ বার। এই ১৫ বারের মধ্যে প্রচণ্ড দাবদাহের কথা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ আছে ৪ বার, মাছ ধরার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে হতে পারে উল্লেখ ৪ বার, আক্রোশবশত ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনার উল্লেখ ৪ বার।

default-image

প্রচণ্ড দাবদাহ ও শুষ্ক আবহাওয়াসহ অধিকাংশ সুপারিশে গুরুত্ব পেয়েছে দাহ্য পদার্থ নিয়ে বনে প্রবেশের বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা, নদী খননের প্রস্তাব এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার চালানোর কথা। এই পুনরাবৃত্তির ধারা প্রমাণ করে, আগের পরামর্শ বাস্তবায়নে ঘাটতি অব্যাহতভাবেই থাকছে।

এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘মে মাসে আগুনের ঘটনার সময় জেলে–মৌয়ালেরা বনে ছিল। প্রতিটি আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটিতে স্থানীয় মানুষের নাম না থাকলেও তদন্ত ও সুপারিশমালা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই তৈরি করা হয়। অতীত থেকেই রেওয়াজ আছে, কোনো সূত্র না পেলে বন বিভাগের ওপর দায় চাপানোর। সে হিসাবেই দায় চাপানো হয়। আর খাল খননের প্রজেক্ট পাস হতে চার থেকে পাঁচ বছর লেগেছে। ওয়াচ টাওয়ারের প্রস্তাব পাস হয়েছিল অস্থায়ীটা। এ কারণে পূর্বের ওয়াচ টাওয়ার যতবারই হয়েছে, তা বাঁশ–খুঁটি দিয়ে বানানো, যা দ্রুত ভেঙে যায়। স্থায়ী ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের প্রস্তাব এখন প্রক্রিয়াধীন।’

তবে কাগজ–কলমের হিসাব বা মানুষের অসৎ ইচ্ছা–অনিচ্ছার বিবেচনা করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে না। সে সুযোগ পেলেই পোড়াতে চায়।

এক বছরে সবচেয়ে বেশিবার বনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে। চারবারই চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ( অবঃ) আলী আহাম্মেদ খান। প্রথম আলোকে জানান, ’ সুন্দরবনের আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বনে আগুন নিয়ে সচেতনতার বিষয়ে প্রচারণা কম। যে কোনো আগুনেই প্রথমে দেখা হয় জীবনের নিরাপত্তার দিকটি। এরপর গুরুত্ব পায় সম্পদ তারপর প্রাকৃতিক সুরক্ষা ’।

default-image

অন্যদের কাছ থেকে শেখা

আগুনের ঘটনা অধিকাংশ সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগে ঘটায় পশ্চিম বন বিভাগের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাদের ব্যবস্থাপনার কথা। পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলছিলেন, ‘পূর্বাঞ্চলে মাইকিং করে সতর্কতা বাড়ানো প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে নদী ও খাল খনন দরকার। প্রয়োজনে ট্রলারে, মসজিদে মাইকিং করে সচেতনতার প্রচার চালাতে হবে। ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের জায়গায় ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করতে হবে, যাতে ধোঁয়া উঠলেই দেখা যায় এবং অবৈধ প্রবেশকারীদের আটকানো যায়।’

সুন্দরবনে কিছু হলে কে যে বনের অভিভাবক, তা বোঝা কঠিন হয়।
আনোয়ারুল কাদির, সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক

সীমানার হিসেবে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতীয় সুন্দরবনের অংশ ২ হাজার বর্গকিলোমিটার কম। সেখানকার বনভূমির গঠনপ্রকৃতিও ভিন্ন। সুন্দরী ও গরানগাছের মতো বৃক্ষের সংখ্যাধিক্যের জন্য বাংলাদেশের অংশকে বলা হয় প্ল্যান্টেড। ভারতীয় অংশকে ধরা হয় বুশ হিসেবে। ভারত তার অংশের বনঘেঁষা লোকালয়ের সঙ্গে বনের সীমানা টেনেছে নাইলনের দড়ি দিয়ে। ফলে কাঁকড়া বা বন্য প্রাণী ধরতে চাইলেই অথবা বনের কাঠ কাটতে চাইলেই যখন-তখন প্রবেশ করতে পারে না গ্রামবাসী। এতে বাঘের সঙ্গে মানুষের সংযোগও কম ঘটে। আমাদের দেশে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারানো বা গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের মুখোমুখি হন। খসরু চৌধুরী বলছিলেন, ‘আগে শিকারিরা দোন ফেলে নৌকা থেকেই কাঁকড়া ধরত। এখন তিনজন করে শিক নিয়ে বনে ঢুকে যায়। বাঘের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশে পর্যটনব্যবস্থা গড়েই উঠেছে অভয়ারণ্যের ভেতরে। ভারতে পর্যটক চলাচলে আছে কঠোর বিধিনিষেধ।’

সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক আনোয়ারুল কাদির জানান, ‘সুন্দরবনে কিছু হলে কে যে বনের অভিভাবক, তা বোঝা কঠিন হয়। সুন্দরবনের কোনো নদীতে কয়লাবোঝাই কার্গো ডুবলে তখন নৌ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে চলে যায়। এভাবে সুন্দরবনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বরাষ্ট্র থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়। সব ক্ষেত্রে বন বিভাগের সব ক্ষমতা নেই। এক অংশে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটে। আরেক অংশে চলে বিষ দিয়ে মাছ মারার উৎসব। অংশীদারি পর্যায়ে কমিটি গঠিত হলেই যে ভালো হবে, তা মনে করার সুযোগ নেই। প্রভাবশালীদের কাছে বন বিভাগ ও বন অনেক ক্ষেত্রেই অসহায়। স্থানীয়‍ সরকারকে সম্পৃক্ত করেও ভালো ফল হয়নি। যারা অংশীদার হবে, তারা কেমন মানুষ, তার ওপর নির্ভর করছে পুরো বিষয়টি। বনের মধ্যে হাজারটা ব্যাপার আছে। ভারতে আলাদা মন্ত্রণালয় আছে। একই জায়গায় যদি এতগুলো মন্ত্রণালয় থাকে, তাহলে আগুন কেন কোনো দুর্ঘটনা বা নাশকতাই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আসলে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। এই কাঠামোগত পরিবর্তন মানে পৃথক সুন্দরবন মন্ত্রণালয় গঠন।’

শেষ কথা

এ বন এতটাই জোয়ার ভাটা নির্ভর যে এখানকার বনজীবীরা বলতো ‘গোনের মাঝি নাইয়ে, বেগোনে মরে বাইয়ে’। সেই গোন আর বেগোনের সময়কালই এখন এখানকার মানুষের কাছে এলোমেলো হয়েছে। বলা হতো সুন্দরবনের নদী বাঁকে বাঁকে বড় হয়। এখন স্থানীয়রা বলেন, বাঁকে বাঁকে শুষ্ক হয় নদী। সুন্দরবনের পরিবর্তন দিয়ে প্রকৃতি জানাচ্ছে তাকে শাসনের যোগ্যতা মানুষের নেই। এর সাথে মনুষ্যসৃষ্ট আগুন যদি সুযোগ পায়, সে অপেক্ষায় বসে থাকবে না দমকলবাহিনীর পানির জন্য। একটা স্ফুলিঙ্গ থেকেও যদি বড় আগুন শুরু হয়, সে অপরাধের ইতিহাস লেখার সময় হয়ত নিজেরাই পাব না।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সুপারিশগুলোও যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলেও হয়ত কিছুটা নিরাপদ হবে সুন্দরবন। আগুন থেকে রক্ষা বা বন্য প্রাণী বাঁচাতে হলেও প্রয়োজন দায়িত্বরত মন্ত্রণালয় ও কর্তাব্যক্তিদের জবাবদিহির মধ্যে আনা। সে জন্য কতখানি প্রস্তুত দায়িত্বরত ব্যক্তিরা?

( প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধি ইনজামামুল হক)

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন