বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮। আর ভারত ও মিয়ানমার থেকে আরও প্রায় আড়াই শ হাতি বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। ২০২০ সালে ২২টি ও ২০২১ সালে ১২টি হাতি মারা গেছে। গত মাসে চট্টগ্রামে হাতির আক্রমণে তিনজন মারা যান। বৈদ্যুতিক ফাঁদ ছাড়াও গুলিতেও হাতি হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত কিংবা দুর্ঘটনায় পড়েও মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জনবলসংকট এবং সাক্ষী ও আসামি হাজির করতে না পারা মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা।

মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য বন বিভাগকে দুষছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বন বিভাগ মামলাগুলো ফেলে রাখে বলে নিষ্পত্তি হয় না। তা ছাড়া মামলা সমাধান নয়। বন বিভাগ কি হাতির নিরাপদ করিডর করেছে? কৃষকদের বুঝিয়েছে? কৃষকদের সঙ্গে বসতে হবে। হাতির নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান করতে হবে। তারা সেটা তো করেনি।

বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান বনসংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রয়েছে ২৬৮টি হাতি। হাতি যাতে বিলুপ্ত না হয়, সে জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম, চকরিয়া ও কক্সবাজার আদালতে হাতি হত্যার মামলা রয়েছে ১৫টি। চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ১০ থেকে ১৫ বছর আগের মামলাও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। চট্টগ্রাম বন আদালতে ২০১৭ সালে চুনতিতে একটি হাতি হত্যার মামলা (নং ২০১/২০১৭) রয়েছে। চুনতি অভয়ারণ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হাতিটি হত্যা করা হয়েছিল। মামলার আসামি ছয়জন। একই আদালতে ২০১৯ সালে রাঙ্গুনিয়ায় হাতি হত্যার একটি মামলা (১৫৮/১৯) রয়েছে। এতে আসামি চারজন। ২০১৮ সালে চুনতিতে আরেকটি হত্যার ঘটনায় মামলা (২০৯/১৮) রয়েছে। এ মামলার অভিযোগ গঠনের সময় দুই আসামির একজন বাদ পড়ে যান।

বন বিভাগ মামলা ফেলে রাখে। তারা কি হাতির নিরাপদ করিডর করেছে? কৃষকদের বুঝিয়েছে? নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান করেছে?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আদালতের বন মামলা পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আসামি না পাওয়াসহ নানা কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতা হয়। আমার জানামতে হাতি হত্যার কোনো মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।’

গত ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া এলাকায় একটি হাতি মারা যায়। বিষয়টি তদন্ত করতে সোনাকানিয়া যান তদন্তকারীরা। তদন্ত দলের প্রধান চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে হাতিটির মৃত্যু হয়েছে।

মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে নিয়োগ না থাকাও একটি কারণ বলে মনে করছে বন বিভাগ। কারণ, বন বিভাগের করা এসব মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান ডেপুটি রেঞ্জার পদধারী বা তার ওপরের কেউ। কিন্তু প্রায় সাড়ে চার শ ডেপুটি রেঞ্জার পদের মধ্যে একটি মাত্র পদে কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকিগুলো শূন্য। আবার ৪০৫টি রেঞ্জার পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫০ জন। ডেপুটি রেঞ্জার পদধারীর বদলে যদি বিট অফিসার বা ফরেস্টারকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে আদালতে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী তা চ্যালেঞ্জ করে বসেন। ফলে মামলা নিষ্পত্তি হয় না।

হাতি রক্ষায় প্রস্তাবিত করিডর

বন্য প্রাণীর অবাধ চলাচলের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পার্শ্ববর্তী ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্দেশীয় একটি করিডরের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের কাজ চলছে। বন বিভাগ ও আইইউসিএনের (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষজ্ঞ দল এ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পে কাজ করছে। এ দলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম মনিরুল এইচ খান ও হাতি বিশেষজ্ঞ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল আজিজ। ডিসেম্বরে তাঁরা প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু করিডর নিয়ে প্রতিবেদন দেবেন।

জানতে চাইলে অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, কাচালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অন্তত তিনটি করিডর রয়েছে। এসব করিডর নানা কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের আওতায় হাতি চলাচলের জন্য দুটি আন্ডারপাস ও একটি ওভারপাস করার কথা ছিল। তা কিন্তু করা হয়নি। অধ্যাপক আজিজ বলেন, হাতির জন্য মিশ্র বন উপযোগী। কিন্তু অনেক জায়গায় বন নেই। স্থাপনা আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ নানা কারণেও বাধাগ্রস্ত হয় হাতির চলাচল।

হাতির চলাচলের পথ নির্বিঘ্ন করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে আইইউসিএন। বন্য প্রাণীর জন্য প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু করিডর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে তারাও বন বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নভেম্বরে আটটি হাতির মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাকিবুল আমিন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘হাতির মৃত্যু হচ্ছে। মামলাও হচ্ছে। কিন্তু অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির আমরা দেখতে পাই না। ফলে হাতির ওপর আক্রমণ বেড়েছে। আবার করিডর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হাতিও লোকালয়ে চলে আসছে। এ জন্য একটি নিরাপদ করিডরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।’

কেন, কারা হাতি হত্যা করে

ফসল রক্ষা এবং আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য মূলত হাতির ওপর আক্রমণ হয়। ফসল রক্ষার জন্য কৃষক বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতেন জমির পাশে। বাড়ির পাশেও একই ধরনের ফাঁদ পাতা হয় বলে বিভিন্ন মামলার সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি বাঁশখালীতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে পড়ে মারা যায় একটি হাতি। এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। তাতে আসামি করা হয় স্থানীয় তিনজনকে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ অনুযায়ী কৃষিজমিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা নিষেধ। এ ছাড়া কোনো বন্য প্রাণী ফসল নষ্ট করলে কৃষককে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয় বন বিভাগ।

বন বিভাগের মামলার পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, বেশির ভাগ হাতি হত্যার কারণ বৈদ্যুতিক ফাঁদ। ফসল রক্ষা করতে কৃষক এটা করেন। কিন্তু তাঁদের ফসলের ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কৃষক নিপুল কুমার সেন হাতির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২৭ নভেম্বর থানায় একটি জিডি করেন। তিনি জানান, রাতে তাঁর বাড়ির উঠানে অবস্থিত ধানের গোলা ভেঙে তিনটি হাতি প্রায় ২০ মণ ধান খেয়ে ফেলেছে। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

গত মাসে (নভেম্বরে) কক্সবাজারে গুলিতে একটি হাতি হত্যা করা হয়। চকরিয়ায় আরেক ঘটনায় হাতি হত্যায় অভিযুক্ত একজনকে গত সপ্তাহে আরেকটি হাতি আক্রমণ করে মেরে ফেলে। তাঁর নাম জানে আলম (৩৬)। তাঁর বিরুদ্ধে ১৩ নভেম্বর চকরিয়ার জঙ্গল হারবাং এলাকায় হাতি হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় তিনি ২ নম্বর আসামি ছিলেন।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন