মুন্সিগঞ্জের চিতলিয়া নদীতে পোঁতা বাঁশে বসা একটি প্রাপ্তবয়স্ক শঙ্খচিল
মুন্সিগঞ্জের চিতলিয়া নদীতে পোঁতা বাঁশে বসা একটি প্রাপ্তবয়স্ক শঙ্খচিলছবি: লেখক

হেমন্তের এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে মুন্সিগঞ্জের চিতলিয়া নদীতে নৌকায় ঘুরছিলাম। কালীর চরের পাশে নদীর এক জায়গায় পোঁতা বাঁশের ওপর বসে ছিল সোনালি ডানা ও সাদা মাথার একটি চিল। আকাশেও উড়ছে এ রকম দু-চারটি পাখি। কোনো কোনোটা বয়সে তরুণ, এখনো রং ফোটেনি। পাখিগুলোকে দেখে কবি জীবনান্দ দাশের ‘হায় চিল’ কবিতাটি মনে পড়ে গেল—

‘হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!

পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;

আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে

বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’

¬কবিতার এই চিল এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি শঙ্খ চিল। লাল চিল, খয়েরি চিল, সোনালি ডানাচিল বা চণ্ডীচিল নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ব্রাহমিনি কাইট। Accipitridae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Haliastur indus। এরা বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় বাস করে।

বিজ্ঞাপন

প্রাপ্তবয়স্ক শঙ্খচিলের দেহের দৈর্ঘ্য ৪৪-৫২ সেন্টিমিটার ও প্রসারিত ডানা ১১০-১২৫ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ৪০৯-৬৫০ গ্রাম ও স্ত্রী ৪৩৪-৭০০ গ্রাম। বুক, ঘাড় ও গলা সাদা, তার ডানার কালো প্রান্ত-পালক বাদে দেহের বাকি অংশ লালচে-খয়েরি। নীলচে ঠোঁটের আগা ফ্যাকাশে। চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলদে। নখ কালো।

স্ত্রী-পুরুষের চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো দেহ বাদামি। এ ছাড়া মাথা-ঘাড়-গলায় ফ্যাকাশে দাগ–ছোপ ও ডানার নিচে ফ্যাকাশে পট্টি রয়েছে।

সুন্দরবনসহ গ্রাম, শহর ও দেশের সর্বত্র, বিশেষ করে জলাশয়ের আশেপাশে এদের দেখা মেলে। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। গাছের ডাল বা অন্য কোনো কিছুতে বসে বা আকাশে বৃত্তাকারে উড়ে উড়ে খাদ্যের সন্ধান করে। মাছের সন্ধান পেলে দ্রুত পানিতে নেমে পায়ের ধারালো নখ দিয়ে ছোঁ মেরে শিকার করে। মাছ ছাড়াও সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ইত্যাদি খেতে পারে। নাকি সুরে ‘কাইই কাইই’ শব্দে ডাকে।

ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় ভূমি থেকে ২-৩০ মিটার উঁচুতে গাছের দোডালা বা তেডালায় (দুই বা দিন ডালের সংযোগস্থল) কাঠিকুটি, ঘাস, আগাছা, আবর্জনা ইত্যাদি দিয়ে ঢিলেঢালা বাসা তৈরি করে। একই বাসা মেরামত করে ফি-বছর ব্যবহার করে। ডিম পাড়ে ১-৩টি, রং সাদা। ডিম ফোটে ২৮-৩৫ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ছানারা প্রায় ৪০-৫৬ দিনে উড়তে শেখে। কিন্তু তারপরও প্রায় দুই মাস মা-বাবার সঙ্গে থাকে। আয়ুষ্কাল ১১-১২ বছর।

মন্তব্য পড়ুন 0