বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে হলে কোন প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রাণীগুলো আমাদের দেশের প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর, তা জানতে হবে
শরীফ-এ–মুকুল, জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো, অস্ট্রেলিয়ার সানসাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোট আইইউসিএন বিশ্বের ১০০টি শীর্ষ আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর তালিকা তৈরি করেছে। তাতে ওই ৬৯ প্রজাতির সব কটির নাম রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কচুরিপানা, আসাম লতা, স্বর্ণলতা, লান্টানা বা লন্ঠন ও বন মটমটিয়ার মতো ব্যাপকভাবে জন্মানো উদ্ভিদ।

এ বিষয়ে গবেষণা দলের সদস্য অস্ট্রেলিয়ার সানসাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো শরীফ-এ–মুকুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আগ্রাসী প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলোর ওপরে আলাদাভাবে নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে। আমরা এসব গবেষণাকে মূল্যায়ন করে একটি সামগ্রিক তালিকা ও চিত্র তুলে ধরেছি। কারণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে হলে কোন প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রাণীগুলো আমাদের দেশের প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর, তা জানতে হবে।’

বাংলাদেশে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির হুমকি শনাক্তকরণ বিষয়ে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কীটপতঙ্গের মধ্যে দুই প্রজাতির পিঁপড়া, মাছের মধ্যে তেলাপিয়া, আফ্রিকান মাগুর, গ্রাসকার্প আছে। এগুলো মারাত্মভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়গুলোতে এসব মাছের কারণে দেশীয় ছোট মাছগুলো টিকে থাকতে পারছে না। বাংলাদেশে লতা–গুল্মজাতীয় বৃক্ষগুলো মূলত আসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। মূলত সৌন্দর্যবর্ধনের নামে এগুলো আনা হয়।

default-image

যেমন ফুলের সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করে ব্রাজিল থেকে কচুরিপানা উদ্ভিদটি নিয়ে আসা হয়। আসাম লতাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর উদ্ভিদ একইভাবে এখানে আনা হয়। আশির দশকে সামাজিক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আকাশমণি, মেহগনিসহ দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়। মূলত কাঠের মূল্য ও দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এসব বৃক্ষ বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামের সাধারণ মানুষও নিজেদের জমিতে বৃক্ষরোপণ করেন। রাস্তার দুই পাশের সামাজিক বনায়নসহ নানা কর্মসূচিতে এসব বৃক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

একইভাবে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের পুকুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ জনপ্রিয় হয়। এ সময় চীনের বিগহেড কার্প, গ্রাসকার্প, আফ্রিকার মাগুর, থাইল্যান্ডের থাই কই দেশে আনা হয়। অবশ্য এর মধ্যে আগ্রাসী বৈশিষ্ট্যের কারণে আফ্রিকান মাগুরের বাণিজ্যিক চাষ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের স্থানীয় অন্যান্য মাছের সঙ্গে এগুলো মিশে গেছে বলে গবেষক দলটি মনে করছে।
তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত রেখে প্রকৃতিবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় বেশির ভাগ ফলমূল বিদেশ থেকে আসা। তবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বনভূমিতে কোনো বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ থাকা ঠিক না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি তার নিজের জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি বৃক্ষ রোপণ করে তাতে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। তবে বাংলাদেশের সব কটি বিদেশি প্রজাতির উদ্ভিদের ওপরে আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ হওয়া প্রয়োজন। সেগুলো কতটুকু পরিবেশের জন্য উপকারী বা ক্ষতিকারক, সেটা মূল্যায়ন করতে হবে।’

default-image

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৬৯টি আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে ৫১ শতাংশই মারাত্মক আগ্রাসী। ৩৬ শতাংশ আগ্রাসী ও ৯ শতাংশ আগ্রাসী হওয়ার আশঙ্কা আছে এমন প্রজাতির। এসব প্রজাতির মধ্যে ২৮ প্রজাতির বৃক্ষ উত্তর আমেরিকা থেকে, ১৭ প্রজাতির এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে, ৯ প্রজাতির আফ্রিকা থেকে ও ৭ প্রজাতির অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৩৮ প্রজাতির গাছ এসেছে স্বাধীনতার আগে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন বিভাগ থেকে গত দুই বছরে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। তার পুরোটাই স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষ। কোন বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ বাংলাদেশের স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষের ওপরে প্রভাব ফেলছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার কাজ বন বিভাগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে। সেটি শেষ হলে এই বৃক্ষগুলোর ব্যাপারে আমরা একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রাণীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশীয় প্রজাতিগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদে স্বাক্ষর করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, দেশীয় ও স্থানীয় প্রজাতিকে রক্ষা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রেও দেশি প্রজাতি রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন