সুন্দর পাখিটির নাম ‘হালতি’। এটি আমাদের দেশে গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখি। মূলত এরা আসে বাসা বেঁধে ডিম-ছানা তুলতে। বাসা বাঁধার মৌসুম ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাসা বাঁধা শেষ হওয়ার পর থেকে ডিম পাড়া শুরু করা পর্যন্ত প্রতি রাতেই এরা মিষ্টি-সুরেলা কণ্ঠে একটানা অনেকক্ষণ ধরে ডাকে।

ডিম পাড়ে চার-ছয়টি। ডিম পাড়া শেষ তো রাতের ডাকও বন্ধ। বাসা করে এরা ছায়াঢাকা বন-বাগানের তলার শুধু মাটির ওপরে, কেটে নেওয়া গাছের গুঁড়ির ওপরে, মোটা গাছের শিকড়-বাকড়ের ফাঁকে ও অন্যান্য জুৎসই জায়গায়। বাসা পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে ক্যামোফ্লেজ হয়ে থাকে। এক মৌসুমে দুবার, এমনকি তৃতীয়বারও নতুন নতুন বাসা বেঁধে ডিম পেড়ে ছানা তুলতে পারে।

পাখিটির সঙ্গে পরিচয় আমার শৈশবকাল থেকে। রাতে ঘরে শুয়ে শুনতাম ‘ডিম পাড়ার গান’। আজও ফকিরহাটের বাড়ি গেলে তা শুনতে পাই। পাখিটি বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে আসে। কিন্তু আজ পর্যন্ত দেশের অন্য কোথাও এদের বাসা-ডিম-ছানার দেখা মেলেনি, একমাত্র ফকিরহাট অঞ্চলের গ্রামীণ বন ছাড়া। অন্যত্র এরা বাসা অবশ্যই বাঁধে।

ফকিরহাট অঞ্চলে প্রতি মৌসুমে গড়ে ১৭টি বাসা পাওয়া গেছে সেই ১৯৯৩ সাল থেকে। প্রতি মৌসুমেই ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাবের সদস্যরা নিবিড় তল্লাশি করে, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ও ছবি তোলে। রবিউল এবার তুলেছেন ১০ দিন বয়সী পাঁচটি ছানার ছবি। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকার সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আমার নির্মিত হালতি পাখির বাসা শীর্ষক একটি প্রামাণ্য ভিডিও চিত্রের আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শনী হয়েছিল।

পাখিটির ইংরেজি নাম ওয়েস্টার্ন হুডেড পিটা। বৈজ্ঞানিক নাম Pitta sordida। ছায়াঢাকা বন-বাগানের তলদেশের মাটিতে হেঁটে বা লাফিয়ে লাফিয়ে এরা ঝরাপাতা উল্টেপাল্টে খায় কেঁচো ও কেঁচোজাতীয় প্রাণী, নানান রকম পোকামাকড় ও লার্ভা।

সুদর্শন হালতির গলা-মাথা-চিবুক কালো। ঘাড় ও মাথার তালু খয়েরি। ডানার ওপরে চওড়া সাদা টান। পেটের নিচটা টকটকে আলতা-লাল। লেজটি খাটো। ছানাদের শরীরে রং ফোটে বেশ দ্রুতই, প্রতিটি পর্যায়ের সৌন্দর্যই দর্শনীয়। ডিম-ছানা বুকে বাসায় বসে থাকা হালতির ছবি এক ফুট দূর থেকেও তোলা যায়। ওড়ে না সহজে।

শরীফ খান, পাখি ও বন্য প্রাণিবিষয়ক লেখক

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন