সুন্দরীর জায়গা নিচ্ছে কাঁকড়াগাছ, কেন এমন হচ্ছে

সুন্দরবনে বাড়ছে কাঁকড়াগাছ। সম্প্রতি খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারীসংলগ্ন বনের অংশে
ছবি: প্রথম আলো

সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের একটি বড় অংশে বনের প্রধান গাছ সুন্দরীর বিন্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যেসব এলাকায় একসময় সুন্দরী ও গেওয়াগাছের প্রাধান্য ছিল, সেখানে এখন ছড়িয়ে পড়ছে কাঁকড়াগাছ। গত ৩৪ বছরে সুন্দরী–গেওয়াপ্রধান এলাকা প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর কমেছে। বিপরীতে কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকার আয়তন বেড়েছে আট গুণের বেশি।

সুন্দরবনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকার উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন। গবেষণার এলাকাটি চাঁদপাই রেঞ্জের ৩০ ও ৩১ নম্বর কম্পার্টমেন্টে। এ জন্য ১৯৮৮ ও ২০২২ সালের উপগ্রহচিত্রের তুলনা করা হয়েছে।

কাঁকড়াগাছের বিস্তার বিষয়ে ‘ডিটেকশন অব কাঁকড়া ট্রি এক্সপ্যানশন ইন দ্য নর্দান সুন্দরবনস’ শিরোনামের গবেষণাটি গত ৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত হয়েছে। সাময়িকীটি নেচার পোর্টফোলিওর অংশ।

গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) এম মাহমুদুর রহমান। গবেষক দলে স্পারসোর পাশাপাশি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষকেরা ছিলেন।

এভাবে বনের একটি অংশে কাঁকড়াগাছের বিস্তার প্রাকৃতিক কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসার কারণে এই পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘমেয়াদি এ প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

এম মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণাটির দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রথমত, দীর্ঘ সময়ের উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে সুন্দরবনে কোন প্রজাতির গাছ কোথায় প্রাধান্য বিস্তার করছে, তা শনাক্ত করার একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ১৯৮৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চাঁদপাই রেঞ্জে প্রধান গাছগুলোর বিস্তারে কী পরিবর্তন হয়েছে, তা পরিমাপ করা।

এভাবে বনের একটি অংশে কাঁকড়াগাছের বিস্তার প্রাকৃতিক কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে আসার কারণে এই পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘমেয়াদি এ প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

গবেষণা দলের প্রধান মাহমুদুর রহমান বলেন, যেখানে কাঁকড়াগাছ হয়, সেখানে অন্যান্য প্রজাতি প্রায় হয় না। এ গাছের একধরনের আগ্রাসী চেহারা আছে। কিন্তু সুন্দরীর সঙ্গে গেওয়া পাশাপাশি থাকে। তাই কাঁকড়াগাছের বৃদ্ধি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলতে পারে তা বলা যায়।

২০২২ সালের চিত্রটি অনেকটাই আলাদা। চাঁদপাই রেঞ্জের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে কাঁকড়াপ্রধান বন বড় একটি অবিচ্ছিন্ন এলাকায় পরিণত হয়েছে। এর চারপাশ এবং মধ্য ও পূর্বাঞ্চলেও কাঁকড়া ছড়িয়ে পড়ছে। তবে দক্ষিণাংশে সুন্দরী ও গেওয়ার প্রাধান্য তুলনামূলকভাবে অক্ষুণ্ন রয়েছে।

কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকা বেড়েছে

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর এলাকায় সুন্দরী ও গেওয়াগাছের প্রাধান্য ছিল। ২০২২ সালে তা কমে প্রায় ১২ হাজার হেক্টরে নেমেছে। অর্থাৎ ৩৪ বছরে এমন বনভূমি কমেছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর।

অন্যদিকে একই সময়ে কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকা ৬৬০ হেক্টর থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৪৩৪ হেক্টরে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ঘন কাঁকড়াগাছপ্রধান এলাকার আয়তন প্রায় ১৭ গুণ হয়েছে।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, সুন্দরী–গেওয়াপ্রধান প্রায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকা সরাসরি কাঁকড়াগাছপ্রধান বনে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে গবেষণা এলাকার এক–চতুর্থাংশের বেশি অংশে ভূমির আচ্ছাদন বা প্রধান গাছের ধরন বদলেছে।

১৯৮৮ সালের মানচিত্রে সুন্দরী ও গেওয়াগাছকে গবেষণা এলাকাজুড়ে প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তখন কাঁকড়াগাছপ্রধান বন ছিল অল্প এবং কয়েকটি বিচ্ছিন্ন স্থানে।

২০২২ সালের চিত্রটি অনেকটাই আলাদা। চাঁদপাই রেঞ্জের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে কাঁকড়াপ্রধান বন বড় একটি অবিচ্ছিন্ন এলাকায় পরিণত হয়েছে। এর চারপাশ এবং মধ্য ও পূর্বাঞ্চলেও কাঁকড়া ছড়িয়ে পড়ছে। তবে দক্ষিণাংশে সুন্দরী ও গেওয়ার প্রাধান্য তুলনামূলকভাবে অক্ষুণ্ন রয়েছে।

গবেষকদের মতে, কাঁকড়ার বিস্তার উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দিকে এগোচ্ছে।

তবে আগের গবেষণার আলোকে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জোয়ারের ধরন বদল, পলি জমা, ভূমিক্ষয় এবং সুন্দরীগাছের আগামরা রোগ।

যেভাবে শনাক্ত করা হয়েছে

গবেষকেরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করেছেন। ১৯৮৮ ও ২০২২ সালের একই ঋতুতে তোলা ছবিতে গাছের পাতায় আলোর প্রতিফলনের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে প্রধান গাছের ধরন শনাক্ত করা হয়।

এর সঙ্গে পুরোনো বন জরিপের মানচিত্র, আগের গবেষণার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে গবেষকেরা সুন্দরবনে গিয়ে ১২টি নমুনা এলাকায় গাছের ধরন, অবস্থান ও ছবি সংগ্রহ করেন। যাচাইয়ে দুই সময়ের মানচিত্রের নির্ভুলতা ৯০ শতাংশের বেশি পাওয়া গেছে।

কেন কাঁকড়াগাছ বাড়ছে

গবেষণাটি কাঁকড়াগাছের বিস্তার শনাক্ত করেছে, কিন্তু কেন এ পরিবর্তন ঘটেছে, তা সরাসরি প্রমাণ করেনি। গবেষণা এলাকার দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততা, জোয়ারের উচ্চতা ও ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য না থাকায় কোনো একটি কারণকে দায়ী করা সম্ভব হয়নি।

তবে আগের গবেষণার আলোকে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জোয়ারের ধরন বদল, পলি জমা, ভূমিক্ষয় এবং সুন্দরীগাছের আগামরা রোগ।

গবেষক দলের সদস্য ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯০ সালের পর থেকেই সুন্দরবনে সুন্দরীগাছের বৃদ্ধি কমছে। এর সঙ্গে উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, লবণাক্ততা ও পলি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।

মো. কামরুজ্জামান বলেন, সুন্দরী বা গেওয়ার জায়গায় প্রাকৃতিকভাবেও কাঁকড়াগাছ জন্মাতে পারে। তবে গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে, কাঁকড়াগাছ আগের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

সুন্দরী সাধারণত কম লবণাক্ত পরিবেশ ও পলিমাটিতে ভালো জন্মে। অন্যদিকে কাঁকড়াগাছ তুলনামূলকভাবে লবণসহিষ্ণু এবং পরিবর্তিত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। ফলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে লবণাক্ততা বাড়লে সুন্দরীর তুলনায় কাঁকড়াগাছ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে।

সুন্দরীগাছ কমে গিয়ে ধারাবাহিক যে ক্ষতি, তা সুন্দরবনের সার্বিক ক্ষতির দিকটাই তুলে ধরছে। বনটির নাম হয়েছে সুন্দরীগাছের কারণে। আর সুন্দরীগাছের বাণিজ্যিক মূল্য কাঁকড়াগাছের কাছে চেয়ে অনেক বেশি। তাই প্রকৃতি এবং বাণিজ্যিক মূল্য— সব বিচারে এটা বনেরই ক্ষতি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান

লবণাক্ততার ক্ষতির প্রমাণ

সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়ে গেলে গাছের বিন্যাস বদলে যেতে পারে—এর পক্ষে আরেক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২২ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ভারতীয় সুন্দরবনের ১৮ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছের উপযুক্ত আবাস বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মাটি ও পানির লবণাক্ততা গাছের বিস্তার ও প্রজাতির বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সঙ্গে সুন্দরীগাছের উপযুক্ত আবাস কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর নানামুখী প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। সুন্দরবনে এভাবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সেই বাস্তবতাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রমাণ হাজির করল। উজানের মিঠাপানির জোগান কমে যাচ্ছে। এর প্রভাবেও ভুগছে সুন্দরবন।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম

সুন্দরীগাছ কমার প্রভাব কী

সুন্দরীকে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বনব্যবস্থার প্রধান প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সুন্দরীর জায়গায় অন্য গাছের আধিপত্য তৈরি হওয়া বনের প্রতিবেশগত অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে বনের গঠন, জীববৈচিত্র্য, গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম এবং প্রাণীদের আবাসস্থলেও প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর নানামুখী প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। সুন্দরবনে এভাবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সেই বাস্তবতাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রমাণ হাজির করল। উজানের মিঠাপানির জোগান কমে যাচ্ছে। এর প্রভাবেও ভুগছে সুন্দরবন।’

গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উপগ্রহচিত্রের একটি অংশে একাধিক প্রজাতির গাছ থাকায় সব ক্ষেত্রে পৃথক গাছ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সমস্যায় মাঠ জরিপও মূলত নদী ও খালের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ ছিল। এরপরও গবেষণাটি প্রথমবারের মতো চাঁদপাই রেঞ্জে কয়েক দশকে কাঁকড়াগাছের বিস্তার এলাকাভিত্তিক হিসাবে তুলে ধরেছে। এটি দেখিয়েছে, বন বাইরে থেকে সবুজ ও অক্ষত মনে হলেও ভেতরে প্রধান গাছের বিন্যাস বড় মাত্রায় বদলে যেতে পারে।

গবেষক দলের সদস্য মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরীগাছ কমে গিয়ে ধারাবাহিক যে ক্ষতি, তা সুন্দরবনের সার্বিক ক্ষতির দিকটাই তুলে ধরছে। বনটির নাম হয়েছে সুন্দরীগাছের কারণে। আর সুন্দরীগাছের বাণিজ্যিক মূল্য কাঁকড়াগাছের কাছে চেয়ে অনেক বেশি। তাই প্রকৃতি এবং বাণিজ্যিক মূল্য— সব বিচারে এটা বনেরই ক্ষতি।