জলপাই-পিঠ তুলিকার কথা
জলপাই-পিঠের সুদর্শন ও চঞ্চল পাখিটিকে প্রথম কবে দেখেছি মনে নেই। তবে ওর প্রথম ছবি তুলেছিলাম গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আমলকীবাগানে ১১ নভেম্বর ২০১০-এর রোদেলা বিকেলে। এরপর বহুবার বহু স্থানে ওকে দেখেছি। তবে ওর সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি বোধ হয় তুলেছিলাম বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে। সেই গল্পটিই বলছি।
সারা রাত বাসভ্রমণ শেষে ভোরবেলা কক্সবাজারের ডলফিন মোড়ে নামলাম। এরপর ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা হোটেলে। হাতমুখ ধুয়ে ফিল্ড-ড্রেস পরে ক্যামেরাসহ রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। ওখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন বন্য প্রাণিপ্রেমী আদনান আজাদ ও ফারজানা রিক্তা। নাশতা সেরে ছয়জনের টিমে ফিশারিঘাটে গিয়ে স্পিডবোটে সোজা সোনাদিয়া। দিনভর সোনাদিয়ার বিভিন্ন চরে ঘুরে ১০টি নতুন প্রজাতিসহ প্রচুর জলচর পাখির ছবি তুলে বিকেলে কক্সবাজার ফিরলাম। পরের দিনও সোনাদিয়ায় ঢুঁ মারার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আদনান ও রিক্তার অনুরোধে সন্ধ্যায় নাইক্ষ্যংছড়িতে আকিজ রেপটাইলস ফার্মে না গিয়ে পারলাম না। আদনান তখন কুমিরের খামারটি তত্ত্বাবধান করছিলেন। খামারে নাকি প্রচুর পাখির আনাগোনা।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সারার আগেই ক্যামেরা হাতে খামারের এদিক-সেদিক ঘুরে বেশ কয়েক প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কুমিরশালায় গিয়ে মধুবাজের দেখা পেলাম। কুমিরেরও কিছু ছবি তুললাম। এরপর নাশতার ডাক পড়ল। নাশতা খেতে রেস্টহাউসের দোতলায় উঠে টেবিলে বসতে যাব, এমন সময় গল্পের শুরুতে যে জলপাই-পিঠের পাখিটির কথা বললাম, সেই প্রজাতির একটি পাখিকে উড়ে আসতে দেখে বারান্দায় গেলাম। পাখিটি ডালপালা ছাঁটা একটি বরইগাছের ডালে বসল। বাইরে চমৎকার আলো। দ্রুত কয়েকটি ক্লিক করলাম। রোদেলা সকালে বরইয়ের ডালে দারুণ ছবি উঠল! এরপর সে বরইয়ের ডাল থেকে গিয়ে বিদ্যুতের তারে বসল। সেখানেও ক্লিক করলাম। কিন্তু অতি চঞ্চল পাখিটি বেশি ক্লিক করার সুযোগ না দিয়ে পালিয়ে গেল। ১৮ জানুয়ারি ২০২০-এর সকাল নয়টার ঘটনা এটি।
এতক্ষণ যে পাখিটির কথা বললাম, সে এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান শীতের পরিযায়ী পাখি জলপাই-পিঠ তুলিকা। এটি অনুবাদ নাম। এ দেশে এর কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। পশ্চিমবঙ্গে মুচাসী নামেও ডাকা হয়। ইংরেজি নাম অলিভ-ব্যাকড পিপিট। Motacillidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Anthus hodgsoni । বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর, মধ্য ও পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
চড়ুইয়ের চেয়ে সামান্য বড় আকারের মুচাসীর দেহের দৈর্ঘ্য ১৫-১৭ সেন্টিমিটার। ওজন ২১-২২ গ্রাম। কালচে বা গাঢ় ঘোলাটে ছিটছোপসহ দেহের ওপরের অংশ জলপাই-সবুজ। ডানার পালকের প্রান্ত উজ্জ্বল জলপাই-সোনালি। ভ্রুর সামনের অংশ ঘিয়ে-হলদেটে ও পেছনটা সাদাটে। কান-ঢাকনির পেছনটায় সাদা ফোঁটা ও কালচে ছোপ। ডানার পালকে দুটি সাদা পট্টি। দেহের নিচটা সাদাটে, বুক-পেটের দুপাশে হালকা ঘিয়ে-হলদেটে ভাব। বুক-পেটে মোটা মোটা কালচে দাগ। লেজের বাইরের পালকগুলো সাদাটে। চোখ কালো। ঠোঁট ধূসরাভ-হলুদ। পা, আঙুল ও নখ গোলাপি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম।
শীতে এদের দেশজুড়ে গাছপালাসম্পন্ন এলাকায় দেখা যায়। ছায়াঢাকা কাষ্ঠল জঙ্গল, ফলের বাগান, বাঁশঝাড়, গ্রামের পথঘাট ও মাঠের ধারে সচরাচর ছোট দলে বিচরণ করে। কখনো কখনো একাকীও দেখা যায়। হাঁটার সময় খানিক পরপর লেজ ওপর-নিচে করে নাচতে থাকে। বিরক্ত হলে বা ভয় পেলে গাছে উঠে যায়। মূলত মাটিতে পাতাসারের ওপর খাবার খোঁজে। কীটপতঙ্গ, তাদের শূককীট এবং ঘাস ও আগাছার বীজ মূল খাবার। র্‘ইইজ্’, ‘ট্সিট্’ বা ভরত পাখির মতো ‘টি টি টি-টিরিচি-টিচি-চিক্-চিক্-চিক্’ স্বরে ডাকে।
মে থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকার শীতল, বনভূমিপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে প্রজনন করে। মাটিতে পাথর কিংবা গাছের নিচে অগভীর খোঁদলে ছোট কাপ আকৃতির বাসা বানায়। স্ত্রী ৩-৫টি বেগুনি-বাদামি ঘন ছিটছোপসহ গাঢ় বাদামি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১২-১৩ দিনে। বাসা বানানো ও ডিম তা দেওয়ার কাজ স্ত্রী নিজেই করে। আর ছানাদের লালন-পালনের কাজ স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে করে। ছানারা প্রায় ১১-১২ দিনে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। সচরাচর প্রতি প্রজনন মৌসুমে দুবার ডিম-ছানা তোলে। আয়ুষ্কাল ২-৫ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর