কখনো স্থানীয় মানুষের কাছে পথ জেনে, কখনো মুঠোফোনে নদীর খোঁজ নিয়ে এগিয়েছি। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামের সীমান্তবর্তী জনপদে দিনভর ঘুরে শেষ পর্যন্ত খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নামে চারটি নদীর দেখা পেলাম। তবে নদীগুলো বাস্তবে আছে, স্থানীয় মানুষের স্মৃতি ও গানেও আছে; কিন্তু সরকারের কোনো তালিকায় নেই।
নদীগুলো ঘুরে দেখার দিনটি ছিল ২৬ আগস্ট। রংপুর অঞ্চলে এই সময়ের তাপপ্রবাহকে বলে ভাদ্রের তালপাকা গরম। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা রংপুর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। এই পথ যাওয়ার জন্য সহজ কোনো বাহন নেই। ট্রেন ভোরবেলা রংপুর থেকে পাটগ্রামে যায়, দুপুরে ফিরে আসে। ট্রেনে গিয়ে নদীর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব নয়। নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের লালমনিরহাট নদী সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক মোশারফ হোসেনের মোটরসাইকেলে সেদিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় আড়াই শ কিলোমিটার চলতে হয়েছে।
খর্প নদ একেবারেই সীমান্তবর্তী নদ। অনেকেই এ নদে মাছ ধরছেন। এই নদ ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে আবারও সে দেশে চলে গেছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্যে জানলাম, নদটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার। খাটুমারা, খাপড়া নদী না পেয়ে মন খারাপ হচ্ছিল। খর্প ও খানা নদ–নদী পেয়ে সেই মন খারাপ কিছুটা ঘোচে।
আগেও লালমনিরহাটের কয়েকটি নদীর নাম শুনেছি। যেমন: খানা, খর্প, খাপড়া, খাটুমারা, চেনাকাটা, চেনাকোলা, সাংগুলি, টেংরামারী। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো দেখা হয়নি। ওই নদীগুলো দেখার উদ্দেশ্য ছিল সেদিন। হাতীবান্ধা উপজেলায় গিয়ে খাপড়া ও খানা নদী খুঁজছিলাম। খাপড়া নদী পেলাম না। অনেকের কাছে খোঁজখবরের পর খানা নদীর সন্ধান দিলেন স্থানীয় আবদুল করিম। নদীটির অবস্থা মরি মরি। বয়স্করা সবাই নদীটি সম্পর্কে অবগত। বছর ৩০ আগেও পানি থাকত। পানির অভাবে তলদেশ ভরাট হচ্ছে। আবদুল করিমের ধারণা, নদীটির দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটারের মতো হতে পারে।
খর্প নদ একেবারেই সীমান্তবর্তী নদ। অনেকেই এ নদে মাছ ধরছেন। এই নদ ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে আবারও সে দেশে চলে গেছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্যে জানলাম, নদটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার। খাটুমারা, খাপড়া নদী না পেয়ে মন খারাপ হচ্ছিল। খর্প ও খানা নদ–নদী পেয়ে সেই মন খারাপ কিছুটা ঘোচে।
সূর্য সেদিন অকৃপণ হাতে তাপ বিলাচ্ছিল। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে আমরা চলে যাই পাটগ্রামে। অনেকের সঙ্গে মুঠোফোনে নদীর বিষয়ে কথা বলি। চেনাকাটা, চেনাকোলা, টেংরামারী, সাংগুলি নদীর খোঁজ করলাম। সবাই চেনাকাটা নদীর কথাই বলতে পারেন। আর কোনো নদীর তথ্য কেউ দিতে পারছিলেন না।
পাটগ্রামে ধরলা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কথা হয় নাজমুল হকের সঙ্গে। তিনি আমাদের টেংরামারী নদীর খবর দিলেন। তাঁর কথামতো এগিয়ে গেলে কদুর বাজারের পাশে আমরা টেংরামারী নদী দেখতে পাই। সেখান থেকে চেনাকাটা নদীর দিকে যেতে আমরা কচুয়া নামে আরেকটি ছোট নদী পাই। সরেজমিন পরিদর্শনে মনে হলো টেংরামারী ও কচুয়া নদী মিলিত হওয়ার পর নাম হয়েছে চেনাকাটা।
চেনাকাটা নদী দেখার পর শামসুল হক নামের এক প্রবীণ ব্যক্তির কাছে জানতে পারি, ওই এলাকায় শালমারা নামে আরেকটি নদী আছে। তাঁর কথার সূত্র ধরে আমরা এগোতে থাকি। তখন সন্ধ্যা নামি নামি করছে। মনোরম পরিবেশ। শালমারা ও চেনাকাটার মিলনস্থলেও গেলাম।
শালমারা নদী দেখে পাশেই ভেরভেরি বাজারে যাই। ছোট বাজার হলেও লোকজন গিজগিজ করছে। একেবারেই সীমান্তবর্তী এলাকা। চায়ের দোকানে আমির নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে জানলাম, সেখানে সংলি নামে একটি নদী জগৎবেড় ইউনিয়নের কোনাবাড়ি দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। তিন কিলোমিটার পর আবার নদীটি ভারতে চলে গেছে।
সাংগুলি নামে একটি নদী খুঁজছিলাম। কিন্তু পেলাম সংলি নদী। উচ্চারণের তারতম্যের কারণে নদীটি সংলি নামে পরিচিত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি।
তবে এবার নদীর খোঁজে গিয়ে বড় আনন্দের ছিল ভেরভেরি বাজারে নদীর গান। নদী নিয়ে আমার নানান রকম প্রশ্ন শুনে লুৎফর রহমান নামের এক মাঝবয়সী লোক এগিয়ে এসে নদীর গান শোনার প্রস্তাব দিলেন। একটি দোকানে বসে শুনলাম একে একে তিস্তা, ধরলা, কচুয়া ও সংলি নদী নিয়ে গাওয়া ভাওয়াইয়া গান।
লুৎফর রহমান দরদভরা কণ্ঠে কচুয়া নদী নিয়ে শোনালেন, ‘আগের মতো নাই আর কচুয়া নদী/ বউ আইসে না আর কলসি ধরি/ মুই কালা আর না বাঁজাও বাঁশরী।’ সংলি নদী নিয়ে গান শোনালেন সবুজ ‘সংলি নদীর ইছলা মাছ রে/ দাদা হ্যাঙ্গা দিয়া মারে।’ যে নদী নেই সরকারের তালিকায়, সেই নদী বেঁচে আছে সংগীতের কথা ও সুরে। সেদিনের পুরো ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছেন ভেরভেরি বাজারের শিল্পীরা।
নিজের অভিজ্ঞতায় ঘুরে দেখা খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলি নদ–নদী সম্পর্কে জানতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তালিকা দেখেছি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকায় এসব নদ–নদীর নাম দেখিনি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী এবং লালমনিরহাট জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও ডিসি মুহ. রাশেদুল হক প্রধানের কাছে নদ–নদীগুলো তালিকাভুক্ত না হওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। দুজনই আমার কাছে তথ্য চাইলেন। তাঁরা নদ–নদীগুলো তালিকাভুক্ত করতে চান। অতীতে আমি তালিকার বাইরে থাকা অনেক নদ–নদী সরেজমিন খুঁজে বের করেছি, যা পরে সরকারের তালিকাভুক্ত হয়েছে। যেমন ২০২৫ সালে রংপুরের খটখটিয়া, নীলফামারীর শাখা দেওনাই, ঠাকুরগাঁওয়ের ভক্তি নদ–নদের নাম পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
তবু একটি প্রশ্ন জাগে, সরকারের তালিকার বাইরে থাকা নদ–নদীগুলো এবারে তালিকাভুক্ত হবে তো?
● তুহিন ওয়াদুদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক