২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এর ঘটনা। বিরল জার্ডনের পাতা বুলবুলির খোঁজে কলেজ শিক্ষক মাসুদ রেজা ভাইয়ের আমন্ত্রণে মেহেরপুরে এসেছি। ওখান থেকে যাব চুয়াডাঙ্গা—দুটি বিরল পাখির সন্ধানে। চুয়াডাঙ্গার পক্ষী আলোকচিত্রী ও বন্য প্রাণী সংরক্ষক স্কুলশিক্ষক বখতিয়ার হামিদ পাখি দুটির সন্ধান পেয়েছেন। যেহেতু মেহেরপুরের বিরল পাখিটির ছবি বখতিয়ার তোলেননি, তাই ওকে মেহেরপুর আসতে বললাম। কিন্তু সে বেশ দেরি করে ফেলল, তাই বিরল পাখিটির দেখা পেল না। তবে সে আমাদের সঙ্গে করে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে গেল। দুপুরে ওর বাসায় পোলাও-মাংস ও শীতের পিঠায় ভূরিভোজ হলো।
ঘণ্টাখানেক বিশ্রামের পর রেললাইনের পাশে জায়গামতো গিয়ে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সময়মতো অতি বিরল ছোট সাতভায়লা (কমন ব্যবলার) এলে ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। এরপর অপেক্ষা দ্বিতীয় বিরল পাখিটির জন্য, যে বর্তমানে এ দেশে সংকটাপন্নও। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় পাখিটি এল। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ওকে ফোকাস করলাম। এরপর যেই না শাটারে ক্লিক করেছি, অমনি সে এমন জোরে সামনের দিকে উড়াল দিল যে ছবিতে একটি বিন্দু হয়ে ধরা দিল।
এরপর কেটে গেছে দুটি বছর। একদিন শ্রীমঙ্গলের পক্ষী আলোকচিত্রী ও বন্য প্রাণী সংরক্ষক খুকন থৌনাউজাম কুরমা পক্ষীনিবাস ও সেখানকার পাখিদের কথা বলল। তার বর্ণনা শুনে বুঝলাম, এই পরিবেশে অবশ্যই চুয়াডাঙ্গার বিরল ও সংকটাপন্ন পাখিটিকে পাওয়া যাবে। একদিন সুযোগমতো সহকর্মী প্রফেসর রফিকুল ইসলামকে নিয়ে শ্রীমঙ্গলের পথে রওনা হলাম। শ্রীমঙ্গল পৌঁছালাম বেলা দেড়টায়। রাধানগরের হার্মিটেজ কটেজ অ্যান্ড রিসোর্টে ব্যাগ রেখে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্টের পাশের মেজবানী রেস্তোরাঁয় দ্রুত লাঞ্চ সারলাম। এরপর ৩০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী কুরমা টি এস্টেটে পৌঁছালাম বেলা সাড়ে তিনটা নাগাদ। না, মোটেও দেরি হয়নি, সঠিক সময়েই পৌঁছেছি। ওখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল খুকন। গাড়ি থেকে নেমে ওর সঙ্গে খানিকটা বাগানের ভেতর ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল অধরা বুড়া বটেরার সঙ্গে।
আকারে ক্ষুদ্র হলেও কুরমা পক্ষীনিবাসটি ছোট ছোট বীজভুক পাখিদের স্বর্গরাজ্য। লাল মুনিয়া, লালগলা ফিদ্দাসহ আট-দশ প্রজাতির ছোট পাখির ছবি তুললাম। কিন্তু সংকটাপন্ন সেই পাখিটির টিকিটিরও দেখা পেলাম না। বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে, আলো কমে আসছে। খুকন ক্যামেরা গুছিয়ে ফেলল। এখন শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওনা হব। আমি বললাম, আর পাঁচটা মিনিট। খুকন সামনে এগিয়ে গেছে এক মিনিটও হয়নি, অমনি একসঙ্গে কোত্থেকে সাত-আটটি পাখি এসে ‘চিপ-চিপ-চিপ...’ শব্দ করতে করতে নলখাগড়ার বিচি খাওয়া শুরু করল। আমি খুকনকে উত্তেজিত কণ্ঠে বললাম, দ্রুত এদিকে এসো, পাখি এসে গেছে। শেষ বিকেলের স্বল্প আলোতে চুয়াডাঙ্গায় ব্যর্থ হওয়া পাখিটির ছবি তুললাম। পরের দিন দুপুরে আবারও দেখলাম। এরপর কুরমার গাছপালা কেটে ফেলার আগপর্যন্ত ওদের দেখেছি নিয়মিত।
এতক্ষণ বিরল ও সংকটাপন্ন যে পাখিটির কথা বললাম, সে এ দেশের আবাসিক পাখি হলদে-চোখ ছাতারে (ইয়েলো-আইড ব্যবলার)। বাগেরহাটে ‘সাদা মইনে’ নামে পরিচিত। পশ্চিম বাংলায় বলে গুলাবচশম। গোত্র প্যারাডক্সওরনিথিডি, বৈজ্ঞানিক নাম Chrysomma sinense। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মেলে।
হলদে-চোখ ছাতারের দৈর্ঘ্য ১৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১৯ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। দেহের ওপরটা লালচে-বাদামি। থুতনি-গলা-বুক সাদা; পেট-তলপেট হলদেটে সাদা। শক্ত মোটা ঠোঁটটি কালো। চোখের চারদিকের বলয় কমলা হলেও মণি হলুদ। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। লেজ লম্বা। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ বেশি লালচে ও ঠোঁট বাদামি।
এরা মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা, তবে খুলনা ও উত্তরবঙ্গেও দেখা যায়। সচরাচর জলাসংলগ্ন লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়ে বাস করে। বেশ লাজুক। জোড়ায় বা ছোট দলে ঝোপঝাড় বা গাছের গোড়ার দিকে আড়ালে-আবডালে ঘুরে বেড়ায়।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়