শীতলপাটির সাদা ফুল
‘চন্দনেরই গন্ধ ভরা,/ শীতল করা, ক্লান্তি–হরা/ যেখানে তার অঙ্গ রাখি/ সেখানটিতেই শীতল পাটি।’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁটি সোনা’ কবিতার শীতলপাটির মতোই এক অদ্ভুত শীতলতায় যেন মনটা জুড়িয়ে গেল, দেহটাও। বৈশাখের সকাল হলেও খোলা জায়গায় যে ভ্যাপসা গরম ছিল, সেটা এই শীতলপাটি বনে এসে কেটে গেল।
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পদ্মপুকুর পাড়টা চমৎকার। পুকুর হলেও জল চাপা পড়েছে পদ্মপাতার আবরণে, ফাঁক দিয়ে দু–একটা লাল পদ্মের কুঁড়ি উঁকি দিচ্ছে। উঁচু একটা ডালে বসে কোকিলটা ডেকেই চলেছে। কে বলবে গ্রীষ্মকাল; মনে হচ্ছে, বসন্ত এখনো ফুরায়নি।
এসব পেরিয়ে পুকুরপাড়ে যেতেই শীতলপাটির শীতল পরশ যেন পেলাম। ছোট ছোট সাদা সাদা প্রজাপতির মতো ডানা মেলে যেন সেসব শীতলপাটির সাদা ফুলেরা আকাশে উড়তে চাইছে। লম্বা একটা ডোবামতো জায়গার মধ্যে আঁটসাঁট ঘন ঝোপ করে রয়েছে অনেকগুলো শীতলপাটি গাছ, ফুলে ফুলে ভরে আছে। ফুলের মঞ্জরিদণ্ডের মাথাটা সুচের মতো সুচালো ও খাড়া। ফুলে ঘ্রাণ না থাকলেও আছে শুভ্র-সুন্দর পবিত্রতা ও শীতলতা।
বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ যাবেন আওরঙ্গজেবের সঙ্গে দেখা করতে; কিন্তু চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি—যাচ্ছেন তো; কিন্তু সম্রাটের জন্য কী উপহার নিয়ে যাবেন? অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে দিল্লির বাদশাহর জন্য নিয়ে গেলেন বাংলার শীতলপাটি। সেই শীতলপাটি পেয়ে বাদশাহ তো ভীষণ খুশি। শোনা যায়, তিনি সেই শীতলপাটি বিছিয়ে তাতে নামাজ পড়তেন। রানি ভিক্টোরিয়া ১৮৭৬ সালে ভারত সম্রাজ্ঞী উপাধি ধারণ করেন। তাঁরও পছন্দের জিনিসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল শীতলপাটি।
শোনা যায়, রানি ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদেও স্থান পেয়েছিল শীতলপাটি। এ দেশে সেকালে যে বিদেশিরা আসতেন, দেশে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁরা যে বাংলায় এসেছিলেন, তা প্রমাণ দেখাতে সঙ্গে নিয়ে যেতেন শীতলপাটি ও মসলিন বস্ত্র। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাংলার শীতলপাটি ২০১৭ সালে পেয়েছে ইউনেসকোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্মান। কথিত আছে, কোনো কোনো শীতলপাটি দক্ষ কারিগরেরা এমন নিপুণ হাতে বোনেন যে সেসব পাটির মসৃণতার কারণে তার ওপর দিয়ে সাপও চলতে পারে না।
শীতলপাটি তৈরি হয় শীতলপাটিগাছ থেকে। সে গাছগুলো এখন চোখের সামনে দেখছি। আগেও অনেকবার দেখেছি, তবে এ রকম পুষ্পশোভিত রূপ কখনো চোখে পড়েনি। টাঙ্গাইল ও সিলেটের স্থানীয় ভাষায় এ গাছকে বলা হয় মুর্তা বা মূর্ত্তা; অন্য নাম পাটিপাতা, পাটিবেত, মুক্তাপাতাগাছ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম পাটি-জং, বরিশালে নাম পাইটরাবন। নোয়াখালীতে এর নাম মোস্তাক। এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Schumannianthus dichotomus, ম্যারান্টেসি গোত্রের গাছ। মুর্তাগাছের ইংরেজি নাম ‘কুলম্যাট’। গাছগুলো দেখতে বাঁশের কঞ্চির মতো, গাঢ় সবুজ, শক্ত, গিঁটওয়ালা ও শাখায়িত একধরনের বহুবর্ষজীবী গুল্ম। তিন থেকে পাঁচ মিটার লম্বা হয়। গাছের গোড়ায় আদার মতো মোথা বা রাইজোম জন্মে। সে কন্দ থেকেই গাছ হয়।
পাতা উপবৃত্তাকার, সূক্ষ্মাগ্র, চকচকে ও গাঢ় সবুজ। পুষ্পমঞ্জরি সরল, কখনো মঞ্জরিদণ্ডের নিচ থেকে শাখা বের হয় ও তাতে বসন্ত-গ্রীষ্মকালে ফুল ফোটে। ফুল সাদা, পাপড়িগুলো সরু, আয়তাকার, অগ্রভাগ গোলাকার বা ভোঁতা। নিচু ও ডোবা, ছায়াময় স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এ গাছ হয়।
এ গাছের ঔষধি গুণ আছে বলে জানা গেছে। জার্নাল অব মেডিসিনাল স্টাডিজ–এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তৃণা চৌধুরী ও সাথি গবেষকেরা লিখেছেন, এ গাছের কন্দ বা রাইজোম জ্বর সারাতে ব্যবহৃত হয় এবং কানের ব্যথা কমায়। এ গাছ ব্যথানাশক, অ্যান্টিডায়াবেটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকলাপ প্রদর্শন করে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেছেন। থাইল্যান্ডের চিংয়াং মাইতে এর ফুল থেকে সকালে জলের ফোঁটা সংগ্রহ করে চোখের কিছু সমস্যা নিরাময়ে সেখানকার লোকেরা ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে।
সিলেটের জামালগঞ্জে প্রচুর এ গাছ আছে। সিলেট ছাড়াও শীতলপাটির গাছ বর্তমানে দেখা যায় টাঙ্গাইলের নাগরপুর, ঝালকাঠি, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ফেনী, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরে। শীতলপাটিগাছগুলোকে ছেড়ে যাওয়ার সময় কবি আরণ্যক বসুর মতো আমারও বলতে ইচ্ছা করছিল, ‘বুকের মধ্যে মস্তো বড় ছাদ থাকবে/ শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;/ সন্ধে হলে বসবো দু’জন।’ আহা কী শান্তি শীতলপাটিতে! আফসোস, কলের পাটির কারণে শীতলপাটির সে ঐতিহ্য আমরা আর ধরে রাখতে পারছি না।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক