বর্ষায় শালবনে শুমচার গান
ভোর পাঁচটার পরপরই বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে তখনো মেঘ। তবে বৃষ্টি নেই, তাতেই খুশি। শালবনে এসেছি একটি পরিচিত পরিযায়ী পাখি দেখতে। গাজীপুরের ভাওয়ালের শালবনসহ দেশের প্রায় সব শালবনেই এই পাখির দেখা মেলে। তবে বর্ষা ছাড়া এই পাখির হদিস পাওয়া যায় না। পাখিটির নাম দেশি শুমচা, ইংরেজিতে বলে ‘ইন্ডিয়ান পিটা’। প্রতিবছর এই পাখি দেখতে যাই শালবনে। এবার গেলাম ভাওয়ালে। রাতযাপন করলাম বাংলাদেশ বন্য প্রাণী কেন্দ্রের রেস্টহাউসে। এর আশপাশেই শালবনের একটি ভালো অংশ আছে।
৬ জুলাই ঠিক সকাল ছয়টায় ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লাম। বন অধিদপ্তরের পাখিবিশারদ শিবলি সাদিক আগেই বলে রেখেছিলেন, এলাকায় পাখিটি সহজেই পাওয়া যাবে। তিনি প্রতি সকালেই এই পাখি দেখেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলাম। শুমচার কোনো খবর নেই। আকাশের মেঘ কিছুটা সরে গেল। আকাশ আগের চেয়ে পরিষ্কার। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক তখন ৭টা ৩০ মিনিট। দেশি শুমচার প্রথম ডাক শুনতে পেলাম। তারও প্রায় ২০ মিনিটের মাথায় পাখিটি একেবারে মাথার ওপর একটি শালগাছে এসে ডাকতে শুরু করল। অপূর্ব মিষ্টি কণ্ঠের এই সুরেলা ডাকে শালবন যেন প্রকৃত বনে রূপ নিল। বেশ কিছু ছবি ওঠালাম। আমাদের দিকে পাখিটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার মতো করে ডেকেই চলেছে। এই ডাকে যে সে তার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।
বেশ কিছু ছবি তোলার পর হঠাৎ পাখিটির ডাক বন্ধ হয়ে গেল। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে এদিক-ওদিক খোঁজা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, কাছেই মাটিতে বসে পাখিটি পোকা ধরে খাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে গাছের পাতা ঝরে পড়লে শালবনের মেঝেতে প্রচুর পাতা জমা হয়। এপ্রিল মাসে বৃষ্টি শুরু হলে এসব পাতা পচে যায়, যা বনের গাছপালার বেড়ে ওঠা ও পুষ্টির জন্য ভালো। এই পচা পাতায় হরেক রকম পোকার আবির্ভাব হয়; আর এই পোকাগুলোই মূলত দেশি শুমচার খাবার। তবে সবচেয়ে প্রিয় খাবার হলো কেঁচো। এক গবেষণায় দেখা যায়, শুমচার মোট খাবারের ৮৬ ভাগই হলো কেঁচো।
মধ্য এপ্রিলে দেশি শুমচা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশের বনগুলোতে আসে। বর্ষাকাল এদের প্রজনন মৌসুম। সংসার গোছানো ও বাচ্চারা বড় হলে মধ্য আগস্টে এরা আবার আমাদের দেশ থেকে পুরো পরিবারসহ বিদায় নেয়। ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটানোর জন্য এরা মাত্র তিন সপ্তাহ সময় পায়। এ সময় পাখিগুলোর প্রচুর খাবারের দরকার হয়। এ জন্য দেশি শুমচারা শালবন পছন্দ করে। উত্তরের অনেক বাঁশঝাড়েও এই পাখি দেখা যায়।
গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় মোট ছয় জাতের শুমচা দেখা যায়। বাংলাদেশে আছে পাঁচ জাতের শুমচা। তিন জাতের শুমচা আমাদের আবাসিক পাখি। দেশি শুমচা মাত্র তিন মাসের জন্য ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমাদের দেশে আসে। বেঁচে থাকার জন্য এদের পাতাঝরা বন আর বৃষ্টি খুব দরকার। বাংলাদেশে শীত নামলে অন্য দেশের যেসব অঞ্চলে বৃষ্টি হয়, সেখানে তারা পাড়ি জমায়।
দেশি শুমচার প্রিয় আবাসস্থল এ দেশে এখনো টিকে আছে; কিন্তু কমে গেছে বনের পোকামাকড়। এর বড় কারণ হলো ঝরা পাতা কুড়ানো মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। পাতা ঝরে পড়লেই দলে দলে মানুষ এই পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় তাদের জ্বালানিকাজের জন্য। এটি একটি প্রাকৃতিক বনের জন্য বড় ক্ষতি। এ জন্য পোকাখেকো পাখিগুলো তাদের খাবারের সংকটে পড়ছে; আর বন হারিয়েছে তার উর্বর ভূমি। ফলে গাছগুলোও অপুষ্টিতে ভুগছে।