প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে কৈশোরোত্তীর্ণ একটি মুসকান্দার দেখা পেয়েছিলাম। গাছতলায় ছড়িয়ে থাকা ঝরা ফুল কুড়িয়ে দেখি তখনো কিছু ঘ্রাণ অবশিষ্ট আছে। ফুলের আকৃতি আর পাতার বৈশিষ্ট্য আমাকে অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাল। কারণ, সচরাচর এমন পাতা আর ফুল চোখে পড়ে না।
আমার সব জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর দিলেন নিসর্গী ও কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তিনিই মূলত শিশু একাডেমির উদ্ভিদ সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ। মনের মাধুরী মিশিয়ে এখানকার নিসর্গশোভা তৈরি করেছেন। লাগিয়েছেন অনেক দুর্লভ উদ্ভিদ। অবসরের পরেও সন্তানসম বৃক্ষরাজির কথা কখনো ভোলেননি।
গাছটি নিয়ে লিখতে বসে অনুভব করেছি, সত্যি, ঢাকায় তো বটেই, সারা দেশেও এই গাছ সংখ্যায় খুবই নগণ্য। এই গাছ আমাদের বন-পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানোর কথা বলা হলেও প্রাকৃতিক আবাসে প্রায় নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বর্তমানে কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা, ডুলাহাজারা, উখিয়া, চট্টগ্রামের দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এবং টেকনাফের মিশ্র চিরসবুজ বনে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গাছ দেখা যায়।
ঢাকায় রমনাপার্ক–সংলগ্ন বেইলি রোড, বলধা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে এ গাছ আছে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান প্রিয় এই ফুল নড়াইলে তাঁর চিত্রশালায় লাগিয়েছেন। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও কয়েকটি গাছ দেখেছি। এ গাছের নাম নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ কেউ ডাকেন কনকচাঁপা নামে। আদতে কনকচাঁপা নামে আরেকটি পুষ্পবৃক্ষ রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে এ গাছ একাধিক নামে পরিচিতÑমুসিগন্ধা, মুস, মুসকুন্দার, মুচকুন্দ, মধুরাবুরা, কাঠচাঁপা, হাত্তিপাইলা, ছাসিয়াবাওন ইত্যাদি। গাছটির ঔষধি গুণের কাছে ফুলের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ অনেকটাই উপেক্ষিত। প্রায় সারা বছর না তাকালেও বসন্তের এলোমেলো বাতাসে যখন চারপাশে ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে, তখন আপনা–আপনিই আমাদের চোখ খুঁজে বের করে গাছটি।
মুসকান্দা (Pterospermum acerifolium) বড় আকৃতির চিরসবুজ বা অর্ধ পাতাঝরা বৃক্ষ, উচ্চতায় ২০ থেকে ৩৫ মিটার এবং বেড় প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। শুকনো ফুলের গন্ধও অনেক দিন অটুট থাকে। পাপড়ির রং দুধসাদা, বেশ কোমল ও ফিতা আকৃতির।
পরাগচক্র সোনালি সাদা, একগুচ্ছ রেশমি সুতার মতো নমনীয় ও উজ্জ্বল। ফুল ঝরে পড়ার পরপরই আসে ফল। ফল ডিম্বাকৃতির, আকারে কিছুটা বড় ও শক্ত ধরনের। উচ্চতার জন্য গাছে ফুল দেখা অনেকটাই কঠিন। ফুল বাসি হলে ঝরে পড়ে। পুরো গাছতলা বাসি ফুলে ছেয়ে যায়।
মুসকান্দার লালচে-বাদামি রঙের কাঠ মোটেও ফেলনা নয়, দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য খ্যাতি আছে। সাধারণত কৃষি সরঞ্জাম, হালকা নির্মাণকাজ, আসবাব, প্লাইউড ও জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়। পাতা গবাদিপশুর উপাদেয় খাদ্য। কক্সবাজার অঞ্চলে অস্থায়ী ঘরের ছাউনিতে পাতা ব্যবহৃত হয়। একসময় গ্রামে এ গাছের পাতায় তামাক ও গুড় বিক্রি হতো। হাত-পা জ্বালাপোড়ায় মানুষ পাতার ডগা ভিজিয়ে রসটুকু খেয়ে নেয়। ফুল জীবাণু ও কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বাকল ও পাতা বসন্ত রোগের মহৌষধ। ফুল থেকে তৈরি টনিক লিকুরিয়া, আলসার, টিউমার, লেপ্রসি ও ক্ষতরোগ নিরাময়ে ব্যবহার্য। এ ছাড়া পতঙ্গনিরোধক হিসেবে পাতার ব্যবহার রয়েছে। বাকল ও পাতা গুটিবসন্ত নিরাময়েও কাজে লাগে। মুসকান্দা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও উত্তর আমেরিকার নিজস্ব গাছ।
আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বেশ কিছু চারা লাগিয়ে গাছটি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক