পাখি সব করে রব

সিলেটের ঘাসিটুলা এলাকার পুকুরে অতিথি পাখি পাতিসরালি। সম্প্রতি তোলা ছবিছবি: আনিস মাহমুদ

ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে পাতিসরালি। আছে জলময়ূর, বক আর ডাহুকও। দিনমান ওড়াউড়ি শেষে সন্ধ্যায় জড়সড় হয়ে কয়েক শ পাখি ঘন হয়ে বসে প্রায় পরিত্যক্ত জলাশয়ের কচুরিপানায়। ততক্ষণে নিঃশব্দে মাটিতে নেমেছে সন্ধ্যার কুয়াশারা। ঝরছে এক-আধ ফোঁটা শিশিরও।

সিলেট নগরের ঘাসিটুলা লামাপাড়া এলাকায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এমন নয়নাভিরাম দৃশ্যের দেখা মেলে। জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করছিলেন কয়েকজন। মাস দেড়েক ধরে শীতের পরিযায়ী পাখিরা এখানে এসে অস্থায়ী আবাস তৈরি করেছে। এসব পরিযায়ী পাখিকে সঙ্গ দিচ্ছে কিছু দেশি পাখিও।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানালেন, ঘাসিটুলা পঞ্চায়েতি কবরস্থান এলাকায় প্রচুর গাছগাছালি রয়েছে। জায়গাটাও তুলনামূলকভাবে নির্জন ও কোলাহলহীন। আশপাশে বাড়িঘরের আধিক্যও কম। কবরস্থান ঘেঁষেই পাশেই বিশাল একটা পুকুর। জলাশয়ে পানি তেমন নেই। তবে কচুরিপানা আর ঘাসে ছেয়ে আছে চারপাশ। প্রতি শীতেই পরিযায়ী পাখিরা এই জায়গা অস্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নেয়।

জলাশয়ের পাশের একটি দোকানের ব্যবসায়ী শাহাদাত ইসলাম জানান, ২০১৯ সাল থেকে তিনি ঘাসিটুলা এলাকায় থেকে ব্যবসা করছেন। প্রতিবছরই শীতে এখানে পাখি আসে। তবে কয়েক বছর ধরে শীতের প্রকোপ কম থাকায় পাখিও কম ছিল। এবার শীত বাড়ায় পাখির সংখ্যাও বেড়েছে। এসব পাখির মধ্যে হাঁস প্রজাতির আধিক্যই বেশি। তবে কেউ শিকার না করায় পাখিরা এখানে নিরাপদে থাকছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পুকুরের দুই পাশে দুটি সাইনবোর্ড। পুকুরটি ঘাসিটুলা কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ ও লামাপাড়া জামে মসজিদের স্থাবর সম্পত্তি বলে এতে উল্লেখ করা রয়েছে। পুকুরের একাংশ এখনো লোকজন ব্যবহার করলেও অনেকটা মৃতপ্রায়। কচুরিপানা, ঘাস, কচুসহ নানা উদ্ভিদ মাথা উঁচু করে আছে। এসব উদ্ভিদকে আশ্রয় করেই হাজারো পাখি বসে আছে, নির্বিঘ্নেœওড়াউড়ি ও খুনসুটি করছে। কোনো কোনো পাখি খাবার খুঁজছে। আবার এক পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু বক ঘুমাচ্ছে। পাখিরা কিচিরমিচির রবে চারপাশ মুখর করে রেখেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় চোখেমুখে অপার বিস্ময় নিয়ে এক কিশোর তার বাবার হাত ধরে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখছিল। ওই কিশোরের বাবা মাহতাব আলী (৪৯) বললেন, পরিযায়ী পাখিরা এখানে দল বেঁধে এসেছে। ব্যস্ততম নগরে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। এটা আসলেই বিরল ঘটনা। স্থানীয় মানুষেরাও এসব পাখিকে জ্বালাতন করেন না। ফলে পাখিরা এখানে নিরাপদ বোধ করছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাখি বেশি এসেছে। এবারের তীব্র শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতেই তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

জলাশয়ের পাশে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে থাকা দুজন দর্শনার্থী জানান, নগরের অনেকে ঘাসিটুলা লামাপাড়া এলাকার পুকুরে পরিযায়ী পাখি আসার খবর জেনে গেছেন। পাখি দেখতে সকাল, বিকেল, সন্ধ্যায় অনেকে ভিড় করছেন। পুকুরের মাঝখানে সাধারণত পাখিরা দল বেঁধে ওড়াউড়ি করছে, খাবারের সন্ধান করছে। বড় পুকুর হওয়ায় পাড়ে থাকা মানুষের উপস্থিতি পাখিদের জন্য খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। এ ছাড়া পাখি দেখতে আসা লোকজনও নেতিবাচক আচরণ করছেন না।

পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, ‘শীতে সিলেটের হাওরাঞ্চলে পাখিশিকারিদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এতে পরিযায়ী পাখিরা অনিরাপদ বোধ করে। সিলেট নগরের ঘাসিটুলা এলাকায় অসংখ্য পাখির উপস্থিতি এটাই নিশ্চিত করে, এখানে তারা নিরাপদ। তাই আমাদের নেতিবাচক আচরণে পাখিরা যেন স্থানটিকে কোনোভাবেই অনিরাপদ মনে না করে, সেটি সবাইকে লক্ষ রাখা উচিত।’