পাহাড়ি গাছ ফুলসুমারি
২০০৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর। রাঙামাটির সকালটা সেদিন ছিল রৌদ্রময়। হিমেল হাওয়া আর নীল আকাশ, ভোরটা ছিল পাতলা কুয়াশায় ঢাকা। একটু বেলা বাড়তেই রাঙামাটির বন্ধু পবন চাকমা তার বিশাল এক মোটরসাইকেল নিয়ে হোটেল সুফিয়ায় এসে হাজির। আজ আমরা এক চাকমাপাড়ায় যাব। রওনা দিতেই রাঙামাটি শহরেই রাস্তার ধারে পাহাড়ি ঢালে বেড়ে ওঠা এক চমৎকার গাছের দেখা পেয়ে দাঁড়াতে হলো। বেশ বড় বৃক্ষ, গাছের মাথার সব ডালপালা ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে প্রশাখাগুলো। ঝুলন্ত সেসব শাখায় মালার মতো শোভা পাচ্ছে ছোট ছোট কদম ফুলের মতো ফুল।
গাছটা অচেনা। কী গাছ? পবনের কাছে জানতে চাইলে সে একটা নাম বলল বটে, কিন্তু নামটা অপরিচিত ঠেকল। ফুলসুমারি নামে এর আগে কখনো কোনো গাছের নাম শুনিনি, দেখিনিও। এমন চমৎকার শোভাময়ী একটা গাছ এত দিন চোখে পড়েনি! পবন বলল, ‘পাহাড়ি গাছ। এ গাছের কাঠ এত শক্ত যে তা কোনো স-মিলে চেরাই করা যায় না, করাত ভেঙে যায়। মানুষেরাও এ গাছ সহজে কাটতে পারে না। বিশেষ করে বয়স্ক গাছ হলে তাকে কেটে কাঠ বের করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়িদের কাছে সেগুনের চেয়ে এ কাঠের কদর বেশি।’ আমি ওর কথা শুনছিলাম ঠিকই, কিন্তু অবাক হয়ে দেখছিলাম একটা গাছে কী করে ঝরনার মতো ফুলের স্রোত নামতে পারে!
এর কোনো বাংলা নাম ও সঠিক পরিচয় না পেয়ে গাছটি নিয়ে লিখতে পারিনি। দীর্ঘদিন এ গাছটার কথা ভুলেই ছিলাম। সম্প্রতি হঠাৎ কানাডাপ্রবাসী স্থপতি মুশতাক কাদরী ভাইয়ের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আবারও উঠে এল গাছটির প্রসঙ্গ। সেই গাছ তিনিও দেখেছিলেন এবং তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ভেবেছিলেন, এ রকম একটি শোভাময়ী গাছ কেন ঢাকার রাজপথের দুপাশে পথতরু হিসেবে কখনো বিবেচনা করা হয়নি! তিনিই এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামটি জানালেন Terminalia pendula var. pendula, আগে এর নাম ছিল Anogeissus acuminata, পরিবার কমব্রিটেসি। অর্থাৎ এটি কাঠবাদাম, বহেড়া, অর্জুনগোত্রীয় গাছ। এ সূত্র ধরেই গাছটি সম্পর্কে নানা তথ্যের খোঁজ শুরু করি। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৭ম খণ্ডের ২৩৬ পৃষ্ঠায় সে গাছের পরিচয় পাই সেই পুরোনো নামেই। সেখানে গাছটির স্থানীয় নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চাকোয়া। অন্যান্য আরও সূত্রে জানা গেল এর আরও কয়েকটি স্থানীয় নাম। ম্রোদের ভাষায় এর নাম ‘ক্রং’। মোস্তফা কামাল পাশা ও শেখ বখতিয়ার উদ্দিনের ডিকশনারি অব প্লান্ট নেমস অব বাংলাদেশ বইয়ে এর আরও একটি প্রতিনাম পেলাম Anogeissus lanceolata এবং খাসিয়া ভাষায় ‘টেংথ্রি’ ও চাকমা ভাষায় ‘ফুলসুমারি’, বাংলা নাম চাকোয়া, সাকুয়া, হেউরি ও কোশই। প্লান্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অনলাইনে এর বর্তমান উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামটি পেলাম, যার ইংরেজি নাম বাটনট্রি। এই গাছ ভারত, চীন ও ভিয়েতনামেও আছে।
নাম খুঁজতে গিয়ে এর একটি ম্রো লোককাহিনিও পেলাম। বান্দরবানে সাইরু নামে যে রিসোর্ট আছে, তার নাম নাকি কোনো এক ম্রো তরুণীর নামে, যে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তার প্রেমিকের জন্য পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। যে জায়গাটিতে সে পড়েছিল সেখানে পরে একটি ফুলসুমারি ও একটি ধারমারাগাছ জন্মে। গাছ দুটি এমনভাবে জন্মে যে তা দেখে মনে হতো তারা যেন পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে। পার্বত্য অঞ্চলে ফুলসুমারিগাছ ঘিরে এরূপ লোককাহিনি আজও প্রচলিত আছে।
ফুলসুমারি মূলত পাহাড়ি গাছ। এটি মাঝারি আকারের, যা ৯ থেকে ৩৫ মিটার লম্বা হয়। এ গাছের ছাল ধূসর-রুপালি রঙের, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে ফাটল দেখা দেয়। তরুণ শাখা কণ্টকযুক্ত। এর পাতা ছোট, যা শীতকালে ঝরে যায় ও বসন্তে নতুনভাবে গজায়। পাতা ঝরার আগে সেগুলো চমৎকার হলদে লাল রং ধারণ করে। শাখা-প্রশাখা ঝুলন্ত ও দোলায়মান। পুষ্পমঞ্জরি ছোট বলের মতো। পাতা উপবৃত্তাকার থেকে ভল্লাকার, ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা, অখণ্ড, বোঁটা রোমশ। পুষ্পবিন্যাস অক্ষীয়। বীজ দ্বারা বংশবৃদ্ধি ঘটে। এর ছোট, হলদে-সবুজ ফুলগুলো প্রায় ১ সেন্টিমিটার চওড়া গোলাকার গুচ্ছে ফোটে। গোলাকার গুচ্ছের ওপর বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকা পুংকেশরগুলোকে রোঁয়ার মতো স্পষ্ট দেখা যায়। ফলগুলো অনেকটা গোলাকার। প্রধানত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফুল ফোটে ও ফল ধরে। তবে রাঙামাটিতে আমি ডিসেম্বরেও ফুল দেখেছিলাম।
এ গাছ কাঠ, পশুখাদ্য ও জ্বালানির জন্য মূল্যবান। এর কাঠ অত্যন্ত শক্ত ও মজবুত, টেকসই। গবেষকেরা বলেছেন, একে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ কঠিনতম কাঠ হিসেবে গণ্য করা হয়। শক্তির তুলনায় তা সেগুনের সমতুল্য। এ গাছের পাতা থেকে গাঢ় সবুজ রং পাওয়া যায়, এমনকি গ্রীষ্মকালে গাছ যখন সবুজ পাতায় ভরে যায়, তখন তা পশুদের খাওয়ানো হয়। লোকজ চিকিৎসায় বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য এই গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন শরীরের কোনো অংশ ফুলে গেলে সাধারণত এর পাতার পেস্ট বা প্রলেপ বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়। আবার মূলের ক্বাথ দাঁতের ব্যথা উপশমে কার্যকর বলে লোকজ চিকিৎসায় পরিচিত।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক