শুধু রাজধানী ঢাকায়ই নয়, সারা দেশেই শব্দদূষণ দিন দিন বাড়ছে। অনেক চালকের মনোভাব দেখে মনে হয়, শুধু হর্ন দিলেই সব সমাধান হয়ে যাবে, কিন্তু হয় উল্টোটা। সমাধানের বদলে আশপাশে থাকা মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং ইউনিটের সাইকোলজিস্ট সাফিনা বিনতে এনায়েত বলেন, উচ্চ শব্দে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ ও উদ্বেগজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা হতে পারে সব বয়সের মানুষেরই। তবে বিশেষভাবে ক্ষতি হতে পারে শিশুদের। দিনের পর দিন শব্দদূষণের শিকার হওয়া শিশুদের মনোযোগ দেওয়া ও কিছু পড়ার ক্ষমতা লোপ পেতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ ঢাকার বাসিন্দাদের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত হর্নের কারণে নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটছে।

সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে শব্দদূষণের কারণে অনেক মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। শব্দদূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। বিশেষ করে ঢাকা শহরে শব্দদূষণের বহু উৎস রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্পকারখানা—এসব ক্ষেত্রে শব্দদূষণ হয় সবচেয়ে বেশি। আর শব্দদূষণের ক্ষেত্রে যে নিয়ম রয়েছে, তা–ও সঠিকভাবে মানা হয় না।

দীর্ঘসময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকার কারণে হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদ্‌রোগ, মাথাব্যথা, স্মরণশক্তি হ্রাস, স্নায়ুর সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কান। অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটালে শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার, এমনকি বধির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ডা. শাহ আলম মুরাদ জানান, অতিরিক্ত শব্দের কারণে কানের নার্ভ ও রিসেপ্টর সেলগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারাতে থাকে। কত ডেসিবেল শব্দে আপনি কতটুকু সময় কাটাচ্ছেন, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। ১২০ ডেসিবেল শব্দের মধ্যে থাকলে আপনার কান সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে ৮৫ ডেসিবেল শব্দ যদি কোনো ব্যক্তির কানে প্রবেশ করে, তাহলে ক্রমশ শ্রবণশক্তি নষ্ট হবে।
শাহ আলম মুরাদ আরও জানান, মানুষ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল শব্দে কথা বলে। ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ মানুষের কান গ্রহণ করতে পারে। ৮০-এর বেশি গেলেই ক্ষতি শুরু হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের করা এক জরিপে উঠে এসেছে, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতিমধ্যেই দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে শব্দদূষণের যে মাত্রা, সেটা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০২৩ সাল নাগাদ এক তৃতীয়াংশ মানুষ এর দ্বারা আক্রান্ত হবে। তারা বধিরতায় আক্রান্ত তো হবেই, পাশাপাশি ক্ষুধামান্দ্য, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, কাজে মনোযোগী হতে না পারা, কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করাসহ হৃদ্‌রোগের সমস্যাও হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যে বিধিমালা রয়েছে, সেখানে বিস্তারিত বলা আছে, কোনো এলাকায় দিনের কোন সময়ে কোন ধরনের শব্দের মাত্রা কেমন হবে। কিন্তু বলতে গেলে কেউই মানছে না এ নিয়ম।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন