সংকটে হাজার বছরের জুমচাষ
জমি সংকোচন, পরিবেশগত চাপ ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বহুফসলি জুমচাষ সংকুচিত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাহাড়ি গ্রাম সীমানাপাড়া। উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে অনেকক্ষণ চলার পর সেখানে দেখা হয় বনেরঞ্জন ত্রিপুরার (৭২) সঙ্গে। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে আছে তাঁর জুম খেত। কোথাও ধান, কোথাও কুমড়া। আবার কোথাও মরিচ, তিল, ভুট্টা, হলুদ কিংবা শিম। এক টুকরা জমিতে একই সঙ্গে নানা ফসলের এ চাষই জুম নামে পরিচিত। তবে এটিই হয়তো বনেরঞ্জনের শেষ কয়েকটি জুমের মধ্যে একটি।
বনেরঞ্জন প্রথম আলোকে বলেন, আগামী বছর থেকে আর জুম করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বয়স হয়েছে। পরিবারে এখন স্ত্রী দন্তরানী ত্রিপুরা ও দুজন পোষ্য ছাড়া আর কেউ নেই। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের কেউই আর জুম চাষে নেই। পাহাড়ে এখন শ্রমিক পাওয়াও কঠিন। এর চেয়েও বড় সংকট জমি।
ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে জুম করতে গিয়ে বনেরঞ্জন দেখেছেন, একই পাহাড়ে ১০ থেকে ১২ বছর পরপর চাষ করা হতো। তত দিনে সেখানে গাছপালা আবার বেড়ে উঠত, মাটিও উর্বরতা ফিরে পেত। এখন সেই সুযোগ নেই। যে পাহাড়ে তিনি এবার জুম করেছেন, সেখানে তিন বছর আগেও চাষ করেছিলেন। তাই আগের মতো ফলন হয় না। এখন জুমে সার ও কীটনাশকও ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ একসময় এসবের প্রয়োজন ছিল না।
মধ্য শ্রাবণের দুপুর পেরিয়ে বিকেল। চারপাশে সবুজের ঢেউ। বনেরঞ্জনের জুম খেতের সবুজ খুব গাঢ় নয়; দূরের পাহাড়ের সবুজ অনেক ঘন, আরও দূরের পাহাড় নীলচে। কাছাকাছি কয়েকটি পাহাড়েও জুম খেত চোখে পড়ে। ক্যামেরা কিংবা ড্রোনের ছবিতে সবুজের এই গালিচা নয়নাভিরাম। কিন্তু খাড়া পাহাড়ে চাষাবাদ কতটা কষ্টের, তা শুধু জুমচাষি বা জুমিয়ারাই জানেন।
এই কষ্ট করেই বনেরঞ্জনের মতো মানুষের জীবন চলে। কিন্তু এখন তাঁর কণ্ঠে হতাশা, ‘আগে জুমের ফসলে সারা বছর চলে যেত। আমার এখনো ১০ মাস চলে যায়। কিন্তু এখন অনেকের ছয় মাসও চলে না। পাহাড়ে আমাদের বাঁচার উপায় কী?’
কৃষি নয়, একটি জীবনব্যবস্থা
বর্ষা এলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় সবুজ গাছপালায় ঢেকে যায়। সেই সবুজের ভেতর কোথাও কোথাও দেখা যায় ছোট ছোট খোলা জমি। সেখানে একই সঙ্গে বেড়ে ওঠে ধান, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, তিল, আদা, হলুদ, শিমসহ নানা ফসল। সমতলের একফসলি জমির সঙ্গে এর বড় পার্থক্য রয়েছে। পাহাড়ের এই বহুফসলি কৃষিপদ্ধতির নাম জুম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে জুম কেবল একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি জীবনযাপন, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব, বিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত জ্ঞানের অংশ।
কিন্তু জুম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এক পক্ষের দাবি, জুম বন উজাড়, মাটিক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, এ ধরনের সরলীকৃত ব্যাখ্যা বাস্তবতার পুরোটা তুলে ধরে না।
জুমের পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে কীভাবে চাষ করা হচ্ছে, কত দিন পর একই জমিতে ফিরে আসা হচ্ছে এবং পাহাড়ের সামগ্রিক ভূমি ব্যবস্থাপনা কেমন—এসব বিষয়ের ওপর। দীর্ঘ সময় পতিত রাখার সুযোগ থাকলে জমিতে আবার গাছপালা জন্মায়, মাটির উর্বরতা ও ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা ফিরে আসতে পারে। কিন্তু পতিতকাল খুব কমে গেলে মাটি, বন পুনর্জন্ম, জীববৈচিত্র্য ও উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির (সিফর-আইসিআরএএফ) গবেষণায় জুমকে কেবল স্থায়ী বন উজাড়ের সঙ্গে এক করে না দেখে, এর চক্রাকার ভূমি ব্যবস্থাপনা, পতিত জমিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের বন গড়ে ওঠা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার সম্পর্ক বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। গবেষণায় এখন জুম বিলুপ্ত করার বদলে উপযুক্ত আবর্তকাল, ভূমির অধিকার ও সমন্বিত ভূদৃশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জুম আসলে কী
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জুম বিভিন্ন নামে পরিচিত—স্থানান্তরিত কৃষি বা শিফটিং কাল্টিভেশন ও সুইডেন অ্যাগ্রিকালচার (ঘূর্ণমান চাষপদ্ধতি)। অনেক সময় এটিকে স্ল্যাশ-অ্যান্ড-বার্ন বা কেটে-পুড়িয়ে চাষও বলা হয়। তবে গবেষকেরা শেষের শব্দটি ব্যবহারে সতর্ক। কারণ, এতে পুরো কৃষিপদ্ধতিকে শুধু গাছপালা কাটা ও পোড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অথচ ঐতিহ্যগত জুম মূলত চাষ ও পতিত রাখার একটি ঘূর্ণমান ব্যবস্থা।
এই পদ্ধতিতে পাহাড়ের একটি জমি সাধারণত অল্প সময় চাষ করার পর কয়েক বছর বা আরও দীর্ঘ সময় পতিত রাখা হয়। এ সময়ে সেখানে স্বাভাবিকভাবে গাছপালা জন্মায়, মাটির উর্বরতা ও ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ে এবং জমি দ্বিতীয় পর্যায়ের বনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। কৃষকেরা এ সময় অন্য জমিতে চাষ করেন এবং আবর্তন শেষে আগের জমিতে ফিরে আসেন।
এই পতিতকালই জুমের প্রাণ। কত বছর পতিত রাখা প্রয়োজন, তার একক সংখ্যা নেই। মাটি, ঢাল, বৃষ্টিপাত, উদ্ভিদের ধরন ও আগের ব্যবহারের তীব্রতার ওপর তা নির্ভর করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবীণ জুমিয়ারা আগে বহু এলাকায় ১০ থেকে ২০ বছর বা তার বেশি সময় পর একই জমিতে ফেরার কথা বলেন। এখন অনেক জায়গায় তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই ফিরতে হচ্ছে।
ঐতিহ্যগত জুমে সাধারণত বড় সেচব্যবস্থা, ভারী কৃষিযন্ত্র বা বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হয় না। মাটিতে গভীরভাবে লাঙলও দেওয়া হয় না। চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, ‘আদিবাসী মানুষ জমিতে কর্ষণ করতে চায় না। তারা এটিকে জমির ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে। জুমে সামান্য একটু মাটি তুলে তাতে বীজ রাখা হয়। ভূমিকে আঘাত নয়, এই দার্শনিক ভাবনা আছে জুমের মূলে। আরেকটি বিষয় হলো, এই পাহাড়ে জুম ছাড়া আসলে বিকল্পও নেই।’
শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের গারো জনগোষ্ঠীর মধ্যেও জুমচাষের প্রচলন আছে।
বাস্তবতা কেন বদলে গেল
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস জুম ছাড়া পূর্ণ হয় না। জমির ব্যবহার, বসতির অবস্থান, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক সম্পর্ক, এমনকি উৎসব ও ধর্মীয় আচারও দীর্ঘদিন ধরে জুমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, চাক, লুসাইসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজস্ব পদ্ধতিতে জুমচাষ করে আসছে। সব জনগোষ্ঠীর জুম এক নয়; স্থানীয় পরিবেশ ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে ফসল, সময় ও পদ্ধতিও বদলে যায়।
গত কয়েক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবহারে বড় পরিবর্তন এসেছে। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে বিপুল উপত্যকা ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং পাহাড়ের ঢালে কৃষির চাপ বাড়ে। পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বসতি, সংরক্ষিত বন, সড়ক, পর্যটন, ফলের বাগান, রাবারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক চাষ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জুমের জন্য উন্মুক্ত জমি কমতে থাকে।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জুমের আবর্তকালে। আগে যে জমি বহু বছর পতিত রাখা যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে আবার চাষ করতে হচ্ছে। ফলে বন পুনর্জন্মের সময় কমে যাচ্ছে, মাটির জৈব উপাদান ও উর্বরতার ওপর চাপ পড়ছে, আগাছা ও রোগবালাই বাড়ছে এবং ফলন কমছে।
জুম কমছে, বদলে যাচ্ছে পাহাড়
জুমের এই পরিবর্তনের কথাই বলেন খাগড়াছড়ির কুমারধনপাড়ার মঞ্জু বিকাশ ত্রিপুরা। মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে জুমে কাজ শুরু করেছিলেন। তখন ৩ আড়ি বা প্রায় ৩০ কেজি ধানের বীজ বোনা হতো। গেলং, কুমপুই, কাইউনচালসহ অন্তত পাঁচ ধরনের দেশি ধান, তিল, তুলা, কুমড়া ও মরিচ একটি জুম খেতেই হতো। একটি খেতই ছিল পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের ভান্ডার।
এবার মঞ্জু বিকাশ বুনেছেন মাত্র ৯ কেজি ধানের বীজ। দেশি ধানের মধ্যে আছে মাত্র তিন কেজি বিনি ধান। বাকিটা উচ্চফলনশীল বি-২০। সঙ্গে কিছু ভুট্টা, মারফা ও মিষ্টিকুমড়া। তিনি বলেন, ‘আমার পরে আমার বংশে আর কোনো জুমিয়া থাকবে না।’
মঞ্জু বিকাশের দুই ছেলে উচ্চশিক্ষিত। একজন রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন, অন্যজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। তাঁরা কেউই পাহাড়ে ফিরে জুম করবেন না।
কুমারধনপাড়ায় এমন পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। এই গ্রামে ১৭০টি পরিবারের বাস। অর্ধেকের বেশি পরিবারের অন্তত একজন তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করেন; কেউ আছেন বিদেশে। পোশাক খাতে যুক্ত অনেকের পরিবারই জুম ছেড়েছে।
দীপন ত্রিপুরারা চার ভাই। তিনিসহ দুজন পোশাকশিল্পের কর্মী। অন্য দুই ভাইও জুম করেন না। দীপন বলেন, ‘বাবা দুই বছর হলো জুমচাষ ছেড়ে দিয়েছেন। বয়সের ভারে এখন আর পারেন না। আমাদের বংশে আর হয়তো কেউ এ চাষ করবে না।’
পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন আয়ের উৎস যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ফলের চাষও বেড়েছে। মঞ্জু বিকাশের শতাধিক আমগাছ আছে; সম্প্রতি লিচুগাছও লাগিয়েছেন। গ্রামের আরও অনেক পরিবার একই পথে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যেও এই পরিবর্তন দেখা যায়। তবে বছর ও উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করলে এসব সংখ্যার তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। সংশ্লিষ্ট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে ২০২০-২১ অর্থবছরের ৯ হাজার ২০ হেক্টর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুমের জমি কমে ৮ হাজার ১৭৪ হেক্টর হয়েছে। একই সময়ে ফল চাষের জমি ৪৬ হাজার ১০৪ হেক্টর থেকে বেড়ে ৫১ হাজার ৮৩২ হেক্টর হয়েছে।
রাঙামাটিতে একই সময়ে জুমের জমি ৬ হাজার ৫১০ হেক্টর থেকে কমে ৫ হাজার ২ হেক্টর এবং ফল চাষের জমি ৩৫ হাজার ৩১৮ হেক্টর থেকে বেড়ে ৩৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জুমের আওতা ছিল ২ হাজার ১৯৫ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে উৎপাদন ২ হাজার ৮১৬ টন থেকে কমে ২ হাজার ১২৮ টন হয়েছে।
বিজ্ঞান কী বলছে
জুম কোনো একটি দেশের কৃষিপদ্ধতি নয়। স্থায়ী কৃষি বিস্তারের বহু আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষ এ পদ্ধতিতে খাদ্য উৎপাদন করত। আজও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের বহু এলাকায় বিভিন্নরূপে জুম টিকে আছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও পাপুয়া নিউগিনির বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গে এই কৃষিপদ্ধতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ পতিতকালসহ ঐতিহ্যগত জুম অনেক ক্ষেত্রে চাষের জমি, দ্বিতীয় পর্যায়ের বন ও বহুফসলি কৃষির মধ্যে একটি চক্র তৈরি করে।
জুমের বড় বৈশিষ্ট্য বহুফসলি চাষ। একটি জুম খেতে একই মৌসুমে বহু ধরনের ফসল জন্মাতে পারে। ধান, ভুট্টা, কুমড়া, লাউ, শিম, বরবটি, মরিচ, তিল, হলুদ, আদা, কচু, ডাল, তুলাসহ নানা ফসল একসঙ্গে চাষ করা হয়। এতে খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়ে। একটি ফসল নষ্ট হলেও অন্য ফসল থেকে পরিবারের খাদ্য বা আয় পাওয়ার সুযোগ থাকে।
জুমচাষ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় আগুন ব্যবহারের কারণে। ঐতিহ্যগত জুমে শুকনা গাছপালা নিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ানোর পর ছাই মাটিতে পটাশসহ কিছু পুষ্টি উপাদান যোগ করে এবং আগাছা দমনে সাহায্য করে। তবে আগুনের পরিবেশগত প্রভাব জমির আকার, ঢাল, আবহাওয়া, আগুন নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ও আবর্তকালের ওপর নির্ভরশীল। তাই ‘আগুন ব্যবহার হয়’—এই একটি তথ্য দিয়ে সব জুমকে পরিবেশবান্ধব বা পরিবেশবিরোধী বলা যায় না।
সাম্প্রতিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, দীর্ঘ আবর্তকালের ঐতিহ্যগত জুম এবং জমির সংকটে তৈরি স্বল্প আবর্তকালের জুমকে এক করে দেখা ঠিক নয়। স্বল্প পতিতকালে দ্বিতীয় পর্যায়ের বন পূর্ণতা পায় না, মাটির জৈব উপাদান কমে, আগাছা বাড়ে এবং উৎপাদনের ওপর চাপ পড়ে।
একইভাবে জুমকে পাহাড়ে বনহানির একমাত্র কারণ বলাও বিভ্রান্তিকর। বাণিজ্যিক কৃষি ও একক ফসলের বাগান, সড়ক ও বসতি সম্প্রসারণ, কাঠ আহরণ, পর্যটন ও উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনসংখ্যার চাপ—সব মিলিয়েই ভূমি ব্যবহার বদলেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমটা কিন্তু হঠাৎ করে আসেনি। এখানে নানা কারণে জুমের জমি সংকুচিত হয়েছে। এর দায় জুমনির্ভর মানুষের ওপর দিলে চলবে না। আর জুম শুধু বাংলাদেশেই হয় না, বিশ্বের অনেক দেশেই হয়। একে সরলভাবে পরিবেশের প্রতিকূল কৃষি বলা যাবে না।
সরকারি নীতিতে নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, জুম বন ধ্বংস করে। সরকারি নথি, উন্নয়ন প্রকল্প ও সংবাদমাধ্যমের অনেক প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতো তুলে ধরা হয়েছে। পাহাড়ে গাছপালা কাটা, শুকানো ও পোড়ানোর দৃশ্য দেখে সহজেই মনে হতে পারে, জুম মানেই স্থায়ী বন উজাড়।
বন বিভাগের অধীন এখনো ‘ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগ’ নামে একটি বিভাগ আছে। বিভাগটির সরকারি বর্ণনায় ঝুম নিয়ন্ত্রণ, ভূমিক্ষয় রোধ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বনায়ন এবং ঝুমিয়া পরিবারের পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।
রাঙামাটি বন বিভাগের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, রাজস্ব বাজেট ও বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মোট ৪০ হাজার ১৪৭ দশমিক ৫০ একর বাগান করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৬০টি ঝুমিয়া পরিবারকে পুনর্বাসন করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলাজনিত কারণে ৪৩৫টি পরিবার পরে পুনর্বাসিত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এ তথ্য পুনর্বাসন উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাও দেখায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার দৃষ্টিতেও জুম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। রাঙামাটির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) মো. আমিনুর ইসলাম বলেন, পাহাড়ে জুম করতে গিয়ে বন পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই চর্চা ভালো নয়।
অন্যদিকে সিফর-আইসিআরএএফের গবেষণায় ঐতিহ্যগত সুইডেন কৃষি এবং স্থায়ীভাবে বন সরিয়ে বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক কৃষি সম্প্রসারণের মধ্যে পার্থক্য করার কথা বলা হয়েছে। জুমে চাষের পর জমি পতিত রেখে গাছপালা ফেরার সুযোগ থাকে; কিন্তু স্থায়ী বাগান বা অন্য ভূমি ব্যবহারে সেই চক্র আর না–ও থাকতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চাপ
বনেরঞ্জনের জুমঘরে বসে কথা বলার সময় তিনি বারবার আক্ষেপ করছিলেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করতে পারছেন না। তাঁর ভাষায়, আগের দিনে হলে মধ্য শ্রাবণেই জুম থেকে কয়েক ধরনের ফল পাওয়া যেত। তিনি বলেন, ‘এখন রোদবৃষ্টি বড় বেখেয়াল। বৈশাখে হয় কম বৃষ্টি, নয়তো ব্যাপক বৃষ্টি। এখন সবকিছু উল্টাপাল্টা।’ দূর পাহাড়ের এই জুমিয়া ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ শব্দগুচ্ছের সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তন ঠিকই টের পান।
জুমচাষ ঋতুচক্র ও বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো বৃষ্টি না হলে বীজ অঙ্কুরিত হয় না বা নষ্ট হয়। আবার অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মাটি ও বীজ ধুয়ে যেতে পারে। অনেক জুমচাষি বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টির সময় ও ধরন অনিশ্চিত হয়েছে। তাঁদের কেউ বৈশাখে বৃষ্টি না হওয়ায় বীজ বপন পিছিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন; কেউ বলেছেন অতিবৃষ্টিতে মাটি ক্ষয় ও নতুন পোকামাকড়ের আক্রমণের কথা।
কুমারধনপাড়ার জুমিয়া নারী কৃষক বিমলা ত্রিপুরা বলেন, অতিরিক্ত গরমে ফসলে প্রভাব পড়ে। পোকা ও আগাছা বেড়েছে। ফলে কীটনাশকের ব্যবহারও বাড়ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং নরওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে বাংলাদেশের গত ৪৩ বছরের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি তুলে ধরে ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা সম্পাদন করেছে ২০২৫ সালে। সেখানে দেখা যায়, বৃষ্টি ও তাপমাত্রা উভয় ক্ষেত্রেই পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ভিন্নধারার সৃষ্টি হয়েছে। আগে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ একটি তাপপ্রবাহ দেখা যেত এ এলাকায়। গত ১০ বছরে তাপপ্রবাহের সংখ্যা তিন থেকে চারটি হয়ে গেছে। আবার বর্ষা–পরবর্তী সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অর্থাৎ ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি গত ১০ বছরে অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে গেছে। চলতি বছর জুলাই মাসে ওই অঞ্চলেই মাত্র এক সপ্তাহে ১ হাজার ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, তাপমাত্রা খুব বেশি হলে সমতলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচ দেওয়া যায়; কিন্তু পাহাড়ের জুমে সেটি সম্ভব নয়। আবার অসময়ে অতি ভারী বর্ষণ জুমের ফসলও নষ্ট করে দিতে পারে।
বীজ ও জুম রক্ষার চেষ্টা
জুমিয়াদের অনেকে বলেন, দুই-তিন দশক আগের বহু ফসল এখন আর দেখা যায় না। দেশি ধানের জাত কমে এসেছে, তুলা প্রায় হারিয়ে গেছে, অনেক স্থানে তিলও কমে গেছে। জুমিয়াদের নিজস্ব বীজভান্ডারও সংকুচিত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির বেসরকারি সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতি জুমিয়াদের ১৫ ধরনের ফসলের বীজ দিচ্ছে। এর মধ্যে তুলা ও তিলও আছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে অনেক ফসল ছিল, যেগুলো এখন উৎপাদিত হয় না। আমরা চাই, তারা আবার সেগুলো উৎপাদন করুক এবং পণ্য নিয়ে বাজারে যাক। সহজে বহন করা যায়, এমন রোজেলা চাষেও আমরা উৎসাহ দিচ্ছি।’
একসময় জুম ছিল মূলত পরিবারের খাদ্যের উৎস। এখন অনেক জায়গায় বাজারের চাহিদা ও নগদ আয়ের বিষয়ও ফসল নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে। জুমের কিছু ফসল তুলনামূলক ভালো দামও পায়।
রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, বাজার অর্থনীতির প্রভাব থেকে জুম মুক্ত থাকবে না। তবে পরিবর্তনটি এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে জুমের বহুফসলি বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় বীজ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জুমিয়াদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান হারিয়ে না যায়।
সংকুচিত হচ্ছে জমি, আবর্তকাল ও উত্তরাধিকার
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমের সংকট শুধু একটি কৃষিপদ্ধতির সংকট নয়। জমি কমছে, আবর্তকাল ছোট হচ্ছে, দেশি বীজ হারাচ্ছে, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং নতুন প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফলবাগান ও বাজারমুখী কৃষির বিস্তার পাহাড়ের অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে।
ঐতিহ্যগত জুমকে নির্বিচার পরিবেশবিরোধী বলা যেমন ভুল; তেমনি স্বল্প আবর্তকাল, অতিরিক্ত চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত আগুনের ক্ষতিকর প্রভাব অস্বীকার করাও ঠিক নয়। প্রশ্নটি তাই জুম থাকবে কি থাকবে না, শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—জুমিয়াদের ভূমির অধিকার, প্রয়োজনীয় পতিতকাল, স্থানীয় বীজ ও জ্ঞান রক্ষা করে এই কৃষিকে কীভাবে টেকসই রাখা যায়।
বনেরঞ্জন ত্রিপুরার পর তাঁর সন্তানেরা হয়তো আর জুম করবেন না। মঞ্জু বিকাশের পরও তাঁর পরিবারে কোনো জুমিয়া থাকবেন না। তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে পাহাড়ের মাটি, বৃষ্টি, বীজ ও ঋতু চিনে নেওয়ার বহু প্রজন্মের জ্ঞান। আর এটিই হয়তো জুমের জমি কমে যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি।