লাল ফুলের ইউক্যালিপটাস

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফুটেছে ইউক্যালিপটাসের লাল ফুলছবি: লেখক

ইউক্যালিপটাসকে যে সময় আমরা অপদেবতার মতো অস্পৃশ্য করে তুললাম, ঠিক সে সময়ই যেন এক দুর্লভ প্রজাতির দুটি গাছ দেখে ইউক্যালিপটাসগাছ নিয়ে ধন্দে পড়ে গেলাম।

এ দেশে অন্তত ছয় প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছ আছে। তবে এর চেয়েও মনে হয় বেশি প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছ আছে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ৭ প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছ আছে। সেখানে এমন একটি প্রজাতির ইউক্যালিপটাস আছে, যা সম্ভবত এ দেশের আর কোথাও নেই।

ইউক্যালিপটাসগাছে সাধারণত সাদা বা ঘিয়ে রঙের ফুল ফোটে, কিন্তু জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সে গাছে ফোটে লাল রঙের ফুল।

শরতের এক দুপুরে মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে হাজির হলাম বিশ্রামাগার মাধবীর কাছে। প্রবেশপথের পাশে রয়েছে একটি বিশাল মাধবীলতার ঝোপ, ফুলহীন, সম্ভবত সেটাই এ দেশের সবচেয়ে বয়স্ক ও বড় মাধবীলতার গাছ।

সে গাছের কোলে বেড়ে উঠেছে একটি ইউক্যালিপটাসগাছ, তার গোড়ায় একটি তরুণ দুর্লভ বাঁশপাতাগাছ। সেই ইউক্যালিপটাসগাছে থোকায় থোকায় ফুল ফুটেছে। শরতের নীলাকাশকে পটভূমি করে ডালের আগায় আগায় থোকা থোকা সেসব ফুল হাওয়ায় দুলে দুলে যেন অভিবাদন জানাচ্ছে। ঠিক টকটকে লাল নয়, অনেকটা ম্যাজেন্টা রং ফুলগুলোর। সে গাছের উল্টো দিকে রাস্তার অন্য পাশে আরেকটি লাল ফুলের ইউক্যালিপটাসগাছ।

এ দুটি গাছ ছাড়া দেশের আর কোথাও এরূপ লাল ফুলের ইউক্যালিপটাসগাছ চোখে পড়েনি। ধন্দটা সে কারণেই।

সরকার গত ১৫ মে ২০২৫ তারিখে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে এ দেশে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণিগাছকে আগ্রাসী গাছ হিসেবে চিহ্নিত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই এখন আর কেউ এ গাছ বেচাকেনা করতে পারবেন না, চারা তৈরি ও লাগাতে পারবেন না। পরিবেশের স্বার্থে আমাদের এ নিয়ম মানতে হবে। অথচ কয়েক বছর আগে এক শরৎকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবু ডাইংয়ে সোনার গুঁড়ামাখা আকাশমণির অজস্র ফুল দেখে কতই–না মুগ্ধ হয়েছিলাম!

এক শরতে টাঙ্গাইলের নলুয়া বাজার থেকে বাসাইলের দিকে যেতে যেতে পথের দুই পাশে সারি করে লাগানো ইউক্যালিপটাসের সাদা ফুল ও বাতাসঘষা পাতার লেবুগন্ধে আমোদিত হয়েছিলাম। সেসব এখন নিষিদ্ধ অনুভূতি, ধূসর স্মৃতি।

ইউক্যালিপটাসের লাল ফুল
ছবি: লেখক

জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ার গাছ ইউক্যালিপটাসকে এ দেশে আনা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে, সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে ছায়াদানকারী উদ্ভিদ হিসেবে লাগানোর জন্য। সারা বিশ্বে ইউক্যালিপটাসের প্রায় ৭০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট ৪৯ প্রজাতির ইউক্যালিপটাস বীজ আমদানি করেছিল। বইপত্র ঘেঁটে বর্তমানে এ দেশের উদ্ভিদ তালিকায় ৬ প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছ আছে বলে জানা গেছে।

এগুলো হলো ইউক্যালিপটাস বা সাদা ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus alba), দুলি ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus camaldulensis), গোলক ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus globulus), রাজ বা তুলার ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus grandis), নীল ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus saligna) ও লালি ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus terreticornis)।

এসব প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছে সাদা বা ঘিয়ে রঙের ফুল ফোটে। এগুলোর কোনো প্রজাতিরই বিপন্নতা যাচাই করা হয়নি, তবে এগুলো এ দেশে দুর্লভ নয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এ দেশে দুলি ও লালি ইউক্যালিপটাসগাছ ভালো জন্মায়।

ঢাকা শহরের বৃক্ষাদির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বন অধিদপ্তর ইউএসএআইডির সহায়তায় এক জরিপ করে ২০২৪ সালে ‘ট্রি ইনভেন্টরি অব ঢাকা সিটি’ নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে যে ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি আছে মেহগনিগাছ, দ্বাদশ অবস্থানে আছে দুলি ইউক্যালিপটাসগাছ।

লাল ফুলের ইউক্যালিপটাসের প্রজাতি Corymbia ficifolia (Syn. Eucalyptus ficifolia), গোত্র মির্টেসি। ইংরাজি নাম রেড ফ্লাওয়ারিং গাম। এ প্রজাতির গাছ অন্যান্য প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছের মতো লম্বা হয় না। মাঝারি আকারের বৃক্ষ, উচ্চতা ১০ মিটার পর্যন্ত হয়। বাকল খসখসে ও বাদামি তন্তুময়। বয়স্ক পাতা মলিন সবুজ, পাতা বড় ও অন্য ইউক্যালিপটাসের চেয়ে চওড়া ও খাটো, অনেকটা ডিম্বাকার বা আয়তাকার। ডালের আগায় গোছা ধরে অনেকগুলো ফুল ফোটে। ফুলের কেশর প্রচুর থাকায় তা দেখতে ব্রাশের মতো দেখায়, রং গোলাপি লাল। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাছ দুটিতে বছরের বিভিন্ন সময় ফুল ফুটতে দেখলেও শরতেই সবচেয়ে বেশি ফুল দেখলাম।

বাংলাদেশের উদ্ভিদ তালিকায় লাল ফুল ফোটা ইউক্যালিপটাস প্রজাতির নাম নেই। তাতে মনে হয়, এটি দুষ্প্রাপ্য। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সাবেক বোটানিস্ট মো. শামসুল হক জানালেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এ দুটি গাছ ছাড়া লাল ফুল ফোটা ইউক্যালিপটাসগাছ দেশের আর কোথাও নেই। তিনি জানান, সম্ভবত ১৯৭৮ সালে গাছ দুটি লাগানো হয়েছিল। গাছটি শুধু এ দেশেই নয়, এর জন্মভূমি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতেও বিপন্ন ও দুর্লভ। প্রকৃতিবিদদের প্রত্যাশা, অন্তত এই দুর্লভ প্রজাতির ইউক্যালিপটাসগাছ দুটি এ দেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকুক।

  • মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ প্রকৃতিবিষয়ক লেখক