যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, সুন্দরবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুল কোনটি? চোখ বুজে বলব, ছইলা। এমন রূপসী ও মধুময়ী ফুল সুন্দরবনে আর দেখিনি। গত ২৯ মে সকালবেলায় খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জের নিকুঞ্জ ভ্যালি রিসোর্ট থেকে একটা দেশি নৌকায় করে বিশ্বাসের খাল বেয়ে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশের সময়ই দেখতে পেলাম সেই সুন্দর ছইলা ফুল।
তখন তীব্র জোয়ারের স্রোত। নদীর ঘোলা পানির সেই স্রোতের টানে নৌকা স্থির রাখা মুশকিল। তবু পাকা মাঝি মনে হলো পরিতোষ দাদাকে। অনুরোধ করতেই নৌকা ঘুরিয়ে গাছটার কাছে নিয়ে গেলেন। জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে। এ সময় আম-কাঁঠালের মধুগন্ধে মাছিরাও ভনভন করে। কিন্তু ছইলা ফুলের ঘ্রাণটা ভারি মিষ্টি, আম-কাঁঠালের মতো তীব্র নয়।
মাঝি বললেন, ছইলাগাছে বুনো মৌমাছি দেখেছেন, কত এসেছে। ওরা এ ফুলের মধু নিয়ে বনের ভেতরে চাকে জমাবে। সে মধুর স্বাদ-গন্ধ সবই আলাদা। তাকে বলে ছইলা মধু। কিন্তু আমার কাছে তখন মধুর চেয়েও বেশি মিষ্টি ওই ছইলা ফুলগুলোর রং। নদীর পানির ওপর যেন গাছ থেকে ওর কেশরগুচ্ছ দুলিয়ে দিয়েছে। রূপকথার রূপাঞ্জল যেন, কেশ ঝুলিয়ে কাউকে আকর্ষণ করতে চাইছে। হোক সে বুনো মৌমাছি। তবে তার কুঁড়িগুলোও কম রূপবতী নয়। আঁটসাঁট গোলাপি চুলের খোঁপা যেন। স্রোতের টান উপেক্ষা করে নৌকার দুলুনির মধ্যেও কুঁড়ি আর ফুলের কয়েকটা ছবি তুলে যে কী শান্তি পেলাম!
স্থানীয় লোকদের কাছে এ গাছ ছইলা নামে পরিচিত হলেও বইপত্রে ওর কয়েকটা নাম পেলাম—ছৈলা, ওড়া ও চাক কেওড়া। ফল দেখতে চ্যাপটা গোলাকার লাটিমের চাকের মতো, তাই এ নাম। পরিপক্ব ফল স্বাদে টক, তা রান্না করে খাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার মানুষ সেই ফল চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করে খান। ছইলার ইংরেজি নাম Crab-apple mangrove, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Sonneratia caseolaris, গোত্র Lythraceae.
ছইলা একটি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, সুন্দরবনের গাছ। গাছ চিরসবুজ, দ্রুতবর্ধনশীল, মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। গাছ ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এ গাছের বাকল তরুণ অবস্থায় মসৃণ থাকে, পরে খসখসে হয়ে যায়। বাকলের রং ধূসর-বাদামি থেকে বাদামি। গাছের গোড়ায় ৫০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা চোখা লাঠির মতো শ্বাসমূল জন্মে। ফুল ফোটে সন্ধ্যাবেলা, ভোরে ঝরে যায়। ফুলে প্রচুর মধু হয়।
সাধারণত জুলাই-আগস্ট থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুল ফুটতে থাকে। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন যে এবার মে মাসেই সে ফুলের দেখা পেলাম। ফুলে সেমাইয়ের মতো পুংকেশরগুচ্ছের আড়ালে পড়ে থাকে পাপড়ি, ওটার দেখাই মেলে না। কেশরগুচ্ছের মাঝখান থেকে উঁকি দেয় চিকন কাঠির মতো গর্ভকেশর। ডালের আগায় ফুল ফোটে। ফল চ্যাপটা গোলাকার, গাঢ় সবুজ, মসৃণ।
ছইলাগাছ তীব্র লবণাক্ততা সহ্য করতে পারলেও মধ্যম লবণাক্ত এলাকায় ভালো জন্মে, বিশেষ করে নদী ও খালের তীরে গভীর কর্দমাক্ত মাটিতে এ গাছ বেশি দেখা যায়।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক