বৃষ্টি হচ্ছে প্রতিদিন, তবু এত গরম কেন
রাজধানীর ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় ঘামছিলেন জহুর হোসেন। তিনি যাবেন মতিঝিল। তাঁর বাড়ি থেকে মেট্রো স্টেশন কাছেই। তবু সামান্য এ পথ রিকশায় এসেছেন। স্টেশন পর্যন্ত এসেই ঘেমে গেছেন অনেকটা। তিনি বলছিলেন, ‘ঘর থেকে বের হলেই ঘেমে যাচ্ছি। অথচ বৃষ্টি হইতেছে। কিন্তু গরম কমার লক্ষণ নাই।’
জহুর হোসেনের মতো অভিজ্ঞতা রাজধানীর পথচলতি মানুষের অনেকেরই। কিন্তু শুধু পথে বেরুনো মানুষের কথাই বলি কেন, যাঁরা ঘরে থেকে রান্না, গৃহকর্ম বা অন্য যেকোনো কাজ করছেন, তাঁদেরও কিন্তু এই গরমে কষ্টের শেষ নেই।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দিন ধরেই চলছে বৃষ্টি আর রোদের লুকোচুরি। আজ রোববার সকালেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। বেলা ১১টার দিকে আকাশ ছিল মেঘলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও বৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যেও কমছে না গরম; বরং ভ্যাপসা ও অস্বস্তিকর আবহাওয়ায় জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
বৃষ্টি হলে সাধারণত গরম কমার কথা; কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, অন্তত কয়েকটি কারণে বৃষ্টির মধ্যেও তাপমাত্রা ও অস্বস্তি কমছে না। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পর সৃষ্ট সুপ্ত তাপ, বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প, মৌসুমি বায়ুর পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়া এবং দক্ষিণ দিক থেকে আসা আর্দ্র বায়ুর আধিক্য।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টির পরও ভূপৃষ্ঠের তাপ দ্রুত কমছে না; বরং তাপ জমে থাকা মাটি ও নগর এলাকার কংক্রিটের কাঠামো বৃষ্টির পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় সুপ্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবেশকে আরও উষ্ণ করে তোলে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও অনেক বেশি। ফলে মানুষের শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। এ কারণেই প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হয়।
এই বর্ষাকালে যে মেঘ সৃষ্টি হয়, এটি ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি থাকে। এই মেঘ থেকে যে বৃষ্টি ঝরে তা দ্রুত স্বস্তি আনে না। আবুল কালাম মল্লিক বলেন, একটানা বৃষ্টি হলে এ সময় স্বস্তির ভাব আসে। কিন্তু সেই একটানা বৃষ্টি তো হচ্ছে না।
চলতি মাসে স্বাভাবিক সময়ের অন্তত এক সপ্তাহ পর দেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। এখন এ বায়ু দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হচ্ছে না।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা বলেন, মৌসুমি বায়ু এরই মধ্যে সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছে, তবে সেটি এখনো পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি। ফলে দেশজুড়ে ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছে না। তিনি বলেন, একই সঙ্গে দক্ষিণ দিক থেকে এবং বঙ্গোপসাগর হয়ে প্রচুর আর্দ্র বায়ু দেশে প্রবেশ করছে। এই আর্দ্র বায়ু বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভ্যাপসা গরমের অন্যতম কারণ।
কাজী জেবুন্নেছা আরও বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি পশ্চিমা লঘুচাপ অবস্থান করছে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলে আর্দ্রতা বেশি থাকছে এবং ভ্যাপসা অনুভূতিও তুলনামূলক বেশি।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে যে বৃষ্টি হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই স্বল্প সময়ের এবং বিচ্ছিন্ন। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। এতে আর্দ্রতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি না হওয়ায় পরিবেশের তাপও পুরোপুরি কমছে না।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হয়ে দেশের অধিকাংশ এলাকায় কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হলে তবেই এই অস্বস্তিকর গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। এর আগপর্যন্ত বৃষ্টি ও রোদের পালাবদলের মধ্যেই ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর অবশ্য পূর্বাভাস দিয়েছে, এ বছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি কম হতে পারে। গরম বাড়তে পারে।
গতকাল শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় পাবনার ঈশ্বরদীতে; ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।