মাংসভোজী কলসগাছ
এমন কিছু গাছ আছে, যা অন্য প্রাণী শিকার করে খায়। শিকার ধরতে সেসব গাছের পাতাগুলো বিশেষ এক গড়নে নিজেদের রূপান্তরিত করে। রূপান্তরিত সে অঙ্গ দেখতে কলসের মতো, ফাঁপা থলের মতো ও মুখ খোলা, মুখে একটা ঢাকনার মতো থাকে।
সেই কলসের মধ্যে একধরনের জারক রস বা ডাইজেস্টিভ ফ্লুইড থাকে। কলসের মুখ দিয়ে কোনো পোকা ঢুকে পড়লে ঢাকনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বন্দী পোকা আর সেখান থেকে বের হতে পারে না। ভেতরের রসে আটকা পড়ে ধীরে ধীরে মারা যায় ও গাছের পুষ্টিতে পরিণত হয়। কলসের ভেতরে নিচের দিকে এমন কিছু গ্রন্থি রয়েছে, যার সাহায্যে পাতা সে পুষ্টিরস শোষণ করে নেয়। এ জন্য এসব বিশেষ শ্রেণির উদ্ভিদগুলো মাংশাসী বা পতঙ্গভুক উদ্ভিদ নামে পরিচিত।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এসব উদ্ভিদ দেখা যায়, যারা Nepenthes গণের গাছ। এগুলো বুনো উদ্ভিদ হলেও এর ব্যতিক্রমী গড়ন ও সৌন্দর্যের কারণে এসব বুনো গাছকে উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা এখন লালন–পালনে বেশ কিছু হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছেন। যে কারণে এখন কলস উদ্ভিদ অনেক উদ্যানে ও বাগানে বাহারি গাছ হিসেবে শোভা পাচ্ছে।
কাতারের দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাচের ছাদের নিচে চমৎকার একটা জীবন্ত গাছের উদ্যান আছে। অন্দরের নানা রকমের গাছপালা দিয়ে ৬ হাজার বর্গমিটারের সে বাগানটি সাজানো, সবুজ আর সবুজ। শান্ত, সিগ্ধ ও মনোরম পরিচ্ছন্ন এক পরিবেশ। এ বছর ৫ জানুয়ারি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দোহায় ট্রানজিটে প্রায় আট ঘণ্টার অবসর পেলাম। এ অবসরে সে বাগানটি ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। বাগানে প্রবেশ করতেই পায়ের কাছে লাল-সবুজ পত্রপল্লবে ঘনভাবে থাকা অ্যানথুরিয়াম গাছগুলো যেন অভিবাদন জানাল। প্রায় ৩০০টি বৃক্ষ আর ২৫ হাজারের মতো গাছ আছে সে বাগানে। বসার সুব্যবস্থা, আছে ভাস্কর্য ও ঝরনা, আলোর ঝরনাধারা ইত্যাদি।
চোখ তুলতেই দেখলাম একটা বৃক্ষের গায়ে ঝুলছে অনেকগুলো কলসগাছ। বাংলাদেশেও এ গাছ দেখেছি। গত বছর জাতীয় বৃক্ষমেলায় বাহারি গাছ হিসেবে কিছু নার্সারিতে সেসব গাছ বিক্রি হচ্ছিল। পূর্ব সিলেটের জঙ্গলেও এ গাছ আছে। বিশেষ করে জাফলংয়ের কাছে জৈয়ন্তিয়া পাহাড়ের বনে। এত কাছ থেকে এ গাছের দেখা পাব, তা ভাবিনি। ছবি তুলে বের হলাম বটে, কিন্তু এর প্রজাতি শনাক্ত করা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়লাম। কলসগাছ গণের উদ্ভিদ, এ গণে সারা পৃথিবীতে ১৭০টি প্রজাতির কলসগাছ রয়েছে। বাংলাদেশে যে কলস গাছ আছে তার প্রজাতি Nepenthes khasiana, গোত্র নেপেনথেসি। সাধারণত পোকারাই এদের শিকার। তবে পৃথিবীতে এমন বৃহদাকারের কিছু কলসগাছ রয়েছে, যারা ছোট ছোট প্রাণীর যেমন ব্যাঙ, পাখি ইত্যাদিও শিকার করতে পারে।
এ গাছের ইংরেজি নাম পিচার প্ল্যান্ট, অন্য নাম মাঙ্কি কাপস বা পিটফল ট্যাপস। এ নাম থেকেই এর বাংলা নামকরণ করা হয়েছে কলসগাছ বা কলসপাতা। পত্রাগ্র রূপান্তরিত হয়ে কলসের মতো আকার ধারণ করে বলেই এর নাম রাখা হয়েছে কলসপাতা। কেউ কেউ মনে করেন, পাতার আগায় থাকা কাপে যখন বৃষ্টির পানি জমে, জঙ্গলের বানরেরা তখন সেই পানি পান করে। এ জন্য একে বলা হয় মাঙ্কি কাপস।