সোনা বউয়ের দেখা

রাজশাহীর পবা উপজেলার রাস্তার পাশের গাছে একটি পুরুষ সোনা বউছবি: লেখক

২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল। দুধরাজের ছবি তোলার জন্য রাজশাহী শহরের অদূরে পবা উপজেলার বায়া গ্রামে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ নাম না জানা একটি ফলদ গাছে চোখে কাজল টানা সোনালি-হলুদ একটি পাখি লাফালাফি করতে দেখে ভ্যান থামালাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখতেই দুর্লভ পাখিটিকে চিনে ফেললাম। দ্রুত ক্লিক করলাম। ছবি তোলার সময় লক্ষ করলাম, অনুসন্ধিৎসু পাখিটি ফল খাওয়া রেখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার এই আচরণে বেশ আনন্দ পেলাম। এর এক বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথম পাখিটিকে দেখেছিলাম।

২০১৮ সালে বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইং গেলাম। উঁচু-নিচু, অসমতল ও কিছুটা টিলাময় এলাকাটি সাঁওতালদের আবাসস্থল। এখানে রয়েছে একটি চমৎকার সর্পিল খাঁড়ি। বন্ধুর এলাকাটিতে পাখি-প্রাণীর কমতি নেই। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রাজশাহী থেকে এখানে পৌঁছাতেই দুপুর ১২টা বেজে গেল। কাজেই সকালের পাখি দেখা সম্ভব হলো না। 

এর আগে মাত্র একবার এসেছিলাম, কিন্তু আচমকা বৃষ্টির কারণে জায়গাটি ঘুরে দেখতে পারিনি। ওখানে কোনো খাবারের দোকান নেই বিধায় বাসস্ট্যান্ডের পাশের একটি ছাপরা হোটেলে গরম-গরম গরুর মাংসে মধ্যাহ্নভোজ সেরে অটোরিকশায় উঠলাম। বেলা ঠিক পৌনে একটায় বাবুডাইং পৌঁছালাম। অটোরিকশা থেকে নেমেই টিলার ওপর অধরা নাগরবাটইয়ের দেখা পেলাম। কিন্তু ছবি তোলার আগেই পালিয়ে গেল।

এরপর বিরল এক রাতচরার খোঁজে খানিকটা ঢালে নামতেই একটি গাছে বেশ কয়েকটি ছোট সহেলি দেখলাম। কিন্তু দুটি ক্লিক করতেই ক্যামেরার ফ্রেমে পবাতে দেখা সেই সোনালি-হলুদ পাখিটির অবয়ব ভেসে উঠল। তবে একটি নয়, দু-দুটি পাখির অবয়ব। কিন্তু এ দুটি পবার পাখিটির মতো তত উজ্জ্বল নয়। একটির তো সাদাটে বুক-পেটে কালো কালো দাগ। আসলে ওদের একটি স্ত্রী ও অন্যটি ছানা। এর আগে দুবার পুরুষের দেখা পেলেও এবারই প্রথম স্ত্রী পাখি ও ছানার দেখা পেলাম।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা পাখিগুলো আমাদের দুর্লভ আবাসিক পাখি সোনা বউ। বেনে-বউ, হলদে বউ, হলদে বসন্ত ও কাজলগৌরী নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ইন্ডিয়ান গোল্ডেন ওরিওল। ওরিওলিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Oriolus Kundoo। বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত এটি বিস্তৃত।

সোনা বউ শালিক আকারের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ২৩-২৬ সেন্টিমিটার। ওজন ৬৫-৭৫ গ্রাম। স্ত্রী পাখি ও পুরুষ পাখির চেহারায় পার্থক্য থাকে। পুরুষের পালক উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ। চোখে কাজলটানা। কালো ডানায় অল্প কিছু হলদে দাগছোপ এবং ডানার মাঝখানে একটি সুস্পষ্ট হলদে পট্টি। লেজ কালো হলেও বাইরের অংশ সম্পূর্ণ হলুদ। 

অন্যদিকে স্ত্রীর দেহের ওপরটা জলপাই-হলুদাভ, ডানা-লেজ কালচে ও জলপাই রঙা। দেহের নিচটা ফ্যাকাশে ও তাতে গাঢ় দাগ থাকে। চোখের কাজল পুরুষের মতো সুস্পষ্ট নয়। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষ চোখের মণি লাল ও ঠোঁট গোলাপি। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঠোঁট কালচে; দেহের নিচটা সাদাটে ও তাতে অসংখ্য কালচে ছিট-ছোপ। 

রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল ও খুলনার গ্রামীণ পরিবেশ, ফলের বাগান ও গাছপালাসম্পন্ন এলাকা এবং বাদাবনে ওদের দেখা মেলে। বেশ লাজুক পাখি। গাছগাছড়ার ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ৬-৩০ ফুটের মধ্যে দো-ডালার মাঝে ঝুলন্ত বাটির মতো বাসা বানায়, যা বাতাসে দোল খায়। ডিম পাড়ে ২-৩টি। কালচে বা লালচে-বাদামি ছিট-ছোপসহ ডিমের রং সাদা বা গোলাপি-সাদা। ডিম ফোটে ১৪-১৮ দিনে। বাবা-মা মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের খাওয়ায়। ছানারা ১৪-২০ দিনে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৫-১০ বছর।

আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়