দুর্নীতির কারণে পানি তহবিলের ২৬ শতাংশ অর্থের অপচয় হচ্ছে

‘পানির শুদ্ধাচার ব্যবস্থাপনা: অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরাছবি: প্রথম আলো

বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানি তহবিলের এক–চতুর্থাংশের বেশি (২৬ শতাংশ) অর্থ দুর্নীতির কারণে অপচয় হচ্ছে। যদিও দুর্নীতির ফলে বাংলাদেশে ঠিক কী পরিমাণ অপচয় হচ্ছে, এর সঠিক তথ্য নেই। তবে দুর্নীতির ফলে পানি ব্যবস্থাপনার অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হচ্ছে।

‘পানির শুদ্ধাচার ব্যবস্থাপনা: অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বক্তারা এসব কথা বলেছেন। আজ বুধবার রাজধানীর কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা এনজিও ফোরাম।

সভার মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানভীর আহমেদ বলেন, পানি তহবিলের এক–চতুর্থাংশ দুর্নীতির কারণে অপচয় হচ্ছে। সবার জন্য পানি ও পয়োনিষ্কাশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতে এই দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

শুদ্ধাচার ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে আলোচনা করেন তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তথ্যপ্রাপ্তির আইন শক্তিশালী, তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত, দুর্নীতি ও আর্থিক ক্ষতির গবেষণা, বাজেট পরিকল্পনা প্রকাশ এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশকে উৎসাহিত করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিতে পরিচালনার দায়িত্ব ও অর্থায়নের বিষয় স্পষ্ট, পর্যবেক্ষণকে শক্তিশালী এবং আর্থিক নিরীক্ষা করে, নিরীক্ষার প্রতিবেদন উন্মুক্ত করতে হবে। অংশগ্রহণ নিশ্চিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গ্রাহকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আর দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতিকারীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে।

তানভীর আহমেদ আরও বলেন, সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক জালিয়াতি, কেনাকাটায় যোগসাজশ, অনুমোদন এবং ছাড়পত্রে চাঁদাবাজি, মেরামত এবং সংযোগের জন্য ‘স্পিড মানি’, মিটার রিডিংয়ে কারসাজির জন্য সহযোগিতার ঘটনা হয়ে থাকে। এসব দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়। ফলে নিম্নমানের অবকাঠামো, সেবার মান এবং সেবাপ্রাপ্তি কমে যায়। আর সমাজের দরিদ্রতম মানুষেরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুর রহমান। সংস্থাটিতে যোগদানের পর তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সেবাদানকারী ও গ্রহীতার মধ্যে ‘গ্যাপ’ রয়েছে। কোনো সমস্যা জানাতে যোগাযোগ নম্বর, হটলাইন সবই আছে; কিন্তু কর্মকর্তারা ফোন ধরেন না। ধরলেই তো ভেজাল আসবে। শুরুই হয় এভাবে। কল ধরেও বলেন, দেখবেন। ওই দেখা পর্যন্তই শেষ।

ঢাকা ওয়াসার ওয়েবসাইটে সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, কর্মকর্তাদের বলে দেওয়া হয়েছে, গ্রাহকের সমস্যা শুনতে। সঙ্গে সঙ্গে সেবা দিতে না পারলেও মানুষের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলে বুঝিয়ে বলতে।

ওয়াটার ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্ক (ডব্লিওআইএন) জার্মানির প্রোগ্রাম লিড ম্যারি গ্যালভিন বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া তহবিলের ২৬ শতাংশই দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা খাতে অপচয় হচ্ছে। অনেক জায়গায় দুর্নীতির কারণে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। পানি সরবরাহের প্রক্রিয়ায় যৌন হয়রানির মতো অপ্রিয় ঘটনাও ঘটছে।

সভায় এনজিও ফোরামের নির্বাহী পরিচালক এস এম এ রশীদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের পলিসি সাপোর্ট ব্রাঞ্চের যুগ্ম সচিব সাইফুল ইসলাম মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন সুইডেন দূতাবাসের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মারটিনেজ বেকস্ট্রম, ইউনিসেফের ওয়াশ স্পেশালিস্ট শফিকুল আলম, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান এবং ওয়াটার ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্কের পরামর্শক কাজী মনির মোশারফ।