তখন প্রকৃতিতে সবে আগমন ঘটেছে বসন্তের। তাপমাত্রা বাড়েনি খুব একটা। ফুল ফুটতে শুরু করেছে বিভিন্ন উদ্ভিদের। এমন এক সময়েই গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি গিয়েছিলাম ময়মনসিংহের ভালুকার হাজির বাজারের এক পার্কে।
মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ডান দিকে চমৎকার কিছু রাইড চোখে পড়ল। এরপর আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম জিরাফ ও পরে হাতির ভাস্কর্য। একটি লোকের ওপর হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। মজার এক দৃশ্য। পার্কজুড়ে তালগাছ, আমগাছ, মানি প্ল্যান্ট আর বিভিন্ন উদ্ভিদের সমারোহ।
ড্রিমওয়ার্ল্ড নামের পার্কটির ভেতর সবকিছু সাজানো গোছানো, নয়নাভিরাম। তালগাছের ওপর একটা মানুষের ভাস্কর্য এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে মনে হয় সত্যিকারের একজন গাছি তালের রস সংগ্রহ করছেন। রয়েছে বিভিন্ন টোপিয়ারি। মাঠের এক কোণে রয়েছে পাহাড়ি আদলে তৈরি একটা ঝরনা। পাশেই বিশাল এক অজগর হাঁ করে আছে ইগল ধরার জন্য। ঝরনার দুই পাশে দুটি পান্থপাদপের গাছ দাঁড়িয়ে আছে পাহারাদারের মতো। পাশেই একটি খেজুরগাছ। পার্কের হাঁটাপথের দুধারে শীতের মৌসুমি ফুল গাঁদা, ডালিয়ার সারি। এরপর বড় দুটি মাঠ। রয়েছে জলটলমলে বিশাল পুকুর। পুকুরের পানিতে রয়েছে ফাইটোপ্লাঙ্কটনের কারণে ঘটে যাওয়া লাল বর্ণের ওয়াটারব্লুম।
এক জায়গায় হাঁটাপথের ওপর লোহার ফ্রেমের গায়ে কার্টেইন ক্রিপারের সবুজ ঝরনা চোখে পড়ল। সরু কাণ্ডের গায়ে গভীর সবুজ, আয়তাকার পাতা নিচের দিকে ঝুলে আছে আর তৈরি করেছে ঘন সবুজ পর্দার। ছবি তুললাম ঝটপট। ঝুলে থাকা সবুজ লতায় ফটক হয়ে উঠেছে সবুজ ও আকর্ষণীয়। ছাদনি লতা নামটি বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মার দেওয়া। ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলে সুন্দর সবুজ পরিবেশ তৈরি হয় বলে এর এমন নামকরণ।
ঘন পাতাওয়ালা এই লতার বৈজ্ঞানিক নাম Tarlmounia elliptica, এটি Asteraceae পরিবারের লতানো উদ্ভিদ। আমাদের পরিচিত ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, এস্টার, সূর্যমুখী এই পরিবারের ফুল। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ কার্টেন ক্রিপার, ভার্নোনিয়া ক্রিপার নামে পরিচিত। Curtain মানে হচ্ছে পর্দা আর Creeper মানে ধীরে ধীরে বা হামাগুড়ি দিয়ে চলা লতাজাতীয় গাছ।
শহরের বিভিন্ন বাড়ি বা ভবনের গায়ে ছাদনি লতা অনেকেরই চোখে পড়ে। দ্রুত বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদকে বাড়ির সীমানাদেয়ালের ওপরে বা ছাদে লাগালে এটি পর্দার মতো লম্বা, ঘন হয়ে ঝুলে পড়ে। তাই বাংলায় এর আরেক নাম পর্দা লতা। চমৎকার প্রাকৃতিক জীবন্ত পর্দা। ছাদ বা বারান্দার ওপরে ঝুলে থাকলে বেড়ে যায় ভবন বা বারান্দার সৌন্দর্য। বাড়ির দেয়ালে এই উদ্ভিদের উপস্থিতি বাড়ির আভিজাত্যের প্রমাণ দেয়। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর বহুতল ভবন ও রিসোর্টকে সবুজের ছোঁয়া দিতে কিংবা আকর্ষণীয় করতে এই উদ্ভিদের চাহিদা অনেক।
বারান্দা বা জানালার পাশে লাগালে ঝুলে পড়া সরু, নরম কাণ্ডগুলো ঘরের গরম কমায় এবং রোদ-কিরণ ঠেকায়। ছাদবাগানে ছাদের গ্রিল বা টবে লাগিয়ে ঝুলিয়ে দিলে একটি সবুজ পর্দা তৈরি হয়, যা ছাদ ঠান্ডা রাখে। লোহার ফ্রেমে বা সানশেডে বেয়ে উঠিয়ে দিলে প্রাকৃতিক ছায়া তৈরি করে এই উদ্ভিদ। এ লতার পর্দা ভবনে পোকামাকড় প্রবেশে বাধা দেয়। ছাদনি লতায় ফুল ফোটে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে।
উদ্ভিদে ‘ক্যাপিচুলাম’ পুষ্পমঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে সাধারণত ছোট সাদা ফুল দেখা যায়। ফুল বেগুনি রঙেরও হতে পারে। পাতা সরু ও লতার দুই পাশে সাজানো থাকে। নোংরা দেয়াল, রেলিং ঢেকে রাখার জন্য আদর্শ এ লতা। কার্টেন ক্রিপারের সুন্দর ফুলগুলো মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকর্ষণ করে। এদের দ্বারা এ উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটে।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ভালোভাবে বৃদ্ধি পায় এ লতা। নিয়মিত ছাঁটাই করে বা ফ্রেমের গায়ে লাগিয়ে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া যায়। এ উদ্ভিদের আদি নিবাস ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড। পরে এটি দক্ষিণ তাইওয়ান ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিযোজিত হয়েছে। এটি আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে জনপ্রিয়।
ছাদনি লতায় অণুজীববিরোধী, পেটের আলসার ও ত্বকের সংক্রমণ প্রতিরোধী রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। উপাদানগুলো হচ্ছে ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ, ট্যানিন ও টারপেনয়েড। ঐতিহ্যগতভাবে এর পাতা জোঁক প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হয় এর আদি নিবাসে। এ উদ্ভিদ থেকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও অন্যান্য ওষুধ উৎপাদনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
চয়ন বিকাশ ভদ্র: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ