সোনালি ঝরনালতা
শরতের নীলাকাশে ভাসছে তুলার মতো মেঘ। তারই পটভূমিতে নেমে এসেছে জলপ্রপাত বা ঝরনার মতো একটি লতা। সবুজ পাতার সেই লতার গিঁটে গিঁটে ফুটছে সোনালি হলুদ ফুল। দারুণ সে দৃশ্য! এ কারণেই হয়তো এ গাছের ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ‘গোল্ডেন ক্যাসকেড ভাইন’। বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘সোনালি ঝরনালতা’।
গাছটির প্রতিষ্ঠিত বাংলা নাম নেই। এটি এখনো বাংলাদেশের উদ্ভিদ তালিকায় যুক্ত হয়নি। সে কারণে বাংলা নামকরণের প্রশ্ন আসেনি। ঢাকার সাভারের বরিশাল নার্সারিতে প্রথম সে গাছের দেখা পেলাম। নার্সারির মো. ইব্রাহিম জানালেন, কয়েক বছর আগে তাঁরা গাছটি আনেন থাইল্যান্ড থেকে। এখন সে গাছে ফুল ফুটছে। বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত ফুল ফোটে। গাছটি বেশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
কিউ সায়েন্সের বিশ্ব উদ্ভিদ তালিকায় গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম পাওয়া গেল Petraeovitex bambusetorum। প্রতিনাম Petraeovitex bambusetorum f. simplicifolia। গোত্র ল্যামিয়েসি।
গোল্ডেন ক্যাসকেড ভাইন একটি লতানো উদ্ভিদ হলেও অন্য লতানো উদ্ভিদের চেয়ে একটু আলাদা। বাসরলতাগাছের ফুলে ভরা লতাগুলো যেমন কাণ্ড থেকে বেরিয়ে মাটির দিকে ঝুলতে থাকে, গোল্ডেন ক্যাসকেড ভাইনের লতাগুলো তেমনি ভূমিমুখী হয়। এই গাছের পাকানো লতা ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত প্রসারিত হয়। পাতা সরল বা ত্রিপত্রিক যৌগিক, ডিম্বাকার, মসৃণ। কিনারা অখণ্ডিত।
গাছটির লতানো কাণ্ড ও ডগায় ফুল ফোটে। বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত ফুলের দেখা পাওয়া যায়। ফুলগুলো ৫০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি লম্বা বেণিতে নিচের দিকে ঝুলে থাকে। সোনালি হলুদ বা ক্রিম সাদা ফুলে ভরা একটি ঝুলন্ত পুষ্পমঞ্জরি কয়েক সপ্তাহ ধরে ফোটে। ফুলে হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ আছে। এর ফুল ফোটার চক্র কয়েক মাস ধরে চলতে পারে। চক্রটি প্রায়ই শীতকাল পর্যন্ত চলে। ফুল ফুটলে উড়ে আসে প্রজাপতি, মৌমাছি ও অন্য পতঙ্গ। সব মিলিয়ে বাগান হয়ে ওঠে জীবন্ত।
যেকোনো রৌদ্রোজ্জ্বল বা আধো ছায়া জায়গায় এ গাছ লাগানো যায়। পানি না জমে না—এমন জায়গায় লাগাতে হয়। তবে গাছ লাগানোর পর কিছুদিন পানি দিতে হয়। বিশেষ করে গাছ টিকে যাওয়ার পর শুষ্ক এবং উষ্ণ দিনে গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া ভালো। মৌসুমে সব ফুল ফোটা শেষ হওয়ার পর গাছ হালকা করে ছেঁটে দিলে গড়ন ভালো হয়। এ ছাড়া তেমন কোনো যত্নের দরকার হয় না। গাছটি খরা সইতে পারে।
এ গাছের আদি নিবাস মালয়েশিয়ার উপদ্বীপ ও বোর্নিও। কিন্তু এখন এটি অনেক দেশেই ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, দ্রুতবর্ধনশীল গাছটি আমাদের দেশে মানিয়ে গেছে। বারান্দার রেলিং, ছাদ, বাগানের দেয়াল, পারগোলা, তোরণ ইত্যাদিকে আরও সুন্দর ও প্রাকৃতিকভাবে মনোরম করতে এটি লাগানো যেতে পারে। এমনকি বড় ঝুলন্ত ঝুড়িতেও উঁচু স্থানে গাছটি রাখা যায়। এর জন্য চাই শুধু কোনো সহায়ক বা অবলম্বন।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক