ক্ষতিকর জেনেও পলিথিন ব্যবহার করেন ৬৩ শতাংশ মানুষ: সমীক্ষা

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক। ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

পলিথিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও এর ব্যবহারে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কেও জেনেও পলিথিন ব্যবহার করেন দেশের ৬৩ শতাংশ মানুষ। সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হলে ৫৫ শতাংশ খুচরা বিক্রেতা পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার করতে রাজি।

পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট আন্ড স্যোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘রিভিজিটিং বাংলাদেশ’স পলিথিন ব্যান: গ্যাপস, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সলিউশন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এই সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।

সমীক্ষায় নিষেধাজ্ঞার ২৩ বছর পরও কেন পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি, সেটার পেছনে আইন বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, পলিথিনের বিকল্প সহজলভ্য না হওয়া ও বৃহৎ উৎপাদকদের বাদ দিয়ে খুচরা পর্যায়ে আইনের প্রয়োগকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পলিথিন কেউ ব্যবহার করলে আইনের প্রয়োগ না হওয়া, পলিথিনের বিকল্প বাজারে নিয়ে আসার ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগের অভাব, বেসরকারি পর্যায়েও কোনো আর্থিক প্রণোদনা না দেওয়াকেও দায়ী করা হয়েছে সমীক্ষায়। পলিথিনের বিকল্প সহজলভ্য করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে এগোনোর সুপারিশ করেছে এসডো।

অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন এসডোর মিডিয়া ও কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েট রামিসা রহমান ও এসডোর রিসার্চ ও ক্যাম্পেইন সহযোগী আয়েশা মোস্তফা।

পলিথিন নিষেধাজ্ঞার প্রাথমিক সফলতা ধরে রাখা যায়নি

সমীক্ষা প্রকাশ অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ২০০২ সালে পলিথিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বেশ কয়েক বছর পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দিকে গার্মেন্টের প্যাকেজিংয়ের জন্য পলিথিনের কাঁচামাল আমদানির অনুমতির অপব্যবহারের কারণে সে সফলতা ধরে রাখা যায়নি।

জিয়াউল হক বলেন, ‘৩০ বছর ধরে আমার যে বোঝাপড়া, তাতে বলা যায় পলিথিন বন্ধ করা একটি জটিল বিষয়। আমি এ পর্যন্ত ৫০টি দিশে গিয়েছি। মাত্র কয়েকটা দেশ পলিথিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।’

নীতিগত অসুবিধার কথা তুলে ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘পলিথিনের যে সংজ্ঞা আইনে দেওয়া হয়েছে, সেটা ব্যাপক ও বিশাল। এটাকে সুনির্দিষ্ট করা দরকার ছিল। আমরা সংজ্ঞার মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে এসেছি। হাতলওয়ালা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হলেও হাতল ছাড়া প্যাকেজিং ব্যাগ নিষিদ্ধ নয়। ফলে পলিথিনের উৎপাদকেরা এটার সুযোগ নিয়েছে। কোনটাকে পলিথিন শপিং ব্যাগ বলছি, সেটাকে সুনির্দিষ্ট করতে হবে।’

২০৩০ সালের মধ্যে সরকার পলিথিন ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জানিয়ে জিয়াউল হক বলেন, ‘পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হলে আমাদের আমদানিও কমাতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিবছর শুল্ক কমছে। এ রকম হলে পলিথিনের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে না।’

এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা একটা সমাধানের পথ খুঁজছি। সবাই মিলে চেষ্টা করলে একটা সমাধান আমরা পেয়ে যাব। ২০০২ সালে নিষেধাজ্ঞার পর ২০০৬ সাল পর্যন্ত পলিথিন নিষিদ্ধ ছিল। তখন তো জীবনযাত্রা থমকে যায়নি। তখন সুপারশপে কাপড়ের ব্যাগ ফ্রি দেওয়া হতো। এখন কেন ২৪ টাকা দিয়ে কিনে নিতে হচ্ছে?’

এসডোর মহাসচিব বলেন, যখন একটা আইন হয়ে যায়, তখন কোনো ধরনের সমঝোতা চলে না। আইন করার আগে সমঝোতা করা যায়।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এসডোর চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, ‘পলিথিনের বিষয়ে আমাদের রিঅ্যাকটিভ না হয়ে প্রোঅ্যাকটিভ (পরে ব্যবস্থা না নিয়ে আগে উদ্যোগী) হতে হবে। সব অংশীজন নিয়ে এমনকি যারা খুচরা পর্যায়ে উৎপাদন করছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো সমাধান আসবে না।’