জন্মের পর থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমার শৈশব কেটেছে ‘বড়বাড়ি’ নামের ছোট্ট এক পাড়ায়—ঢাকার ধামরাই উপজেলার বালিয়া গ্রামে। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে, ১৯৫০-এর দশকে, এ অঞ্চল ছিল ঢাকা শহর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এক নিস্তব্ধ গ্রাম। যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল নদী আর খাল।
তখন বর্ষার তিন-চার মাস বংশী নদী হয়ে ঢাকা থেকে নাগরপুর পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করত। এই বংশী নদী ধলেশ্বরী থেকে উৎপন্ন হয়ে নানা গ্রাম পেরিয়ে তুরাগে গিয়ে মিশত। বর্ষা নামলেই নদী-খাল ভরে উঠত, আর সেগুলোই হয়ে উঠত মানুষের চলাচল, বাণিজ্য ও জীবিকার প্রধান পথ।
কিন্তু বর্ষা শেষে পানি কমতে শুরু করলে একে একে সব নৌপথ বন্ধ হয়ে যেত। তখন যাতায়াত হয়ে উঠত কষ্টসাধ্য—কখনো হেঁটে, কখনো ছোট নৌকায়, আবার কখনো পালকিতে। এই পুরো অঞ্চলের জীবনযাত্রা নির্ভর করত মৌসুমি পানির ওপর।
বালিয়া খাল: এক জীবন্ত জলপথ
আমাদের বড়বাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে যেত বালিয়া খাল। এর উৎস ছিল বংশী নদী। বর্ষা এলেই খালটি জীবন্ত হয়ে উঠত। প্রথমে পানি নামত খালে, তারপর তা ছড়িয়ে পড়ত বিল-ঝিল ও নিম্ন ভূমিতে। কয়েক দিনের মধ্যেই ছোট নৌকা চলতে শুরু করত, মাছ ধরা শুরু হতো, আর পুরো গ্রাম যেন পানির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেত।
এই খাল শুধু পানির পথ ছিল না—এটি ছিল জীবনের অংশ।
কৃষিকাজ
মাছ ধরা
বাজারে যাওয়া
এমনকি শিশুদের খেলাধুলা—সবকিছুই এই খালকে ঘিরে
বর্ষার প্রথম পানি পুকুরে ঢোকার দিনটি ছিল এক উৎসবের মতো। মাছের প্রাচুর্য, পানির উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন জীবন দিত।
ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে
১৯৫৭ সালের পর আমি এলাকা ছাড়ি। পরে ফিরে দেখি—খাল নেই, নদী নেই। বালিয়া খাল শুকিয়ে গেছে। তার জায়গায় হয়েছে রাস্তা, বসতবাড়ি। বংশী নদী—যে নদী একসময় খরস্রোতা ছিল, আজ প্রায় মৃত। বর্ষা ছাড়া সেখানে স্রোত নেই, অনেক জায়গায় হেঁটেই পার হওয়া যায়।
শুধু বংশী নয়, ধলেশ্বরী নদীরও অধিকাংশ অংশ আজ নাব্যতা হারিয়েছে। দেশের প্রধান নদীগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক—বর্ষার কয়েক মাস ছাড়া বছরের বাকি সময় অনেক জায়গায় পানির প্রবাহ থাকে না।
বর্তমান খাল খনন কর্মসূচি: বাস্তব প্রশ্ন
এখন দেশে ‘খাল খনন’ কর্মসূচি চালু হয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় খালের ভূমিকা অপরিসীম।
তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না—যে খালের সঙ্গে কোনো নদীর সংযোগ নেই, সেখানে খনন করে কী ফল পাওয়া যাবে?
কারণ:
খাল টিকে থাকতে হলে তার উৎস ও নিষ্কাশন দরকার।
নদীর সঙ্গে সংযোগ না থাকলে সেখানে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ তৈরি হবে না।
বর্ষার পানি জমলেও তা স্থির পানিতে পরিণত হবে।
ফলে তা মশা ও রোগজীবাণুর প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে যেখানে খালের জায়গা দখল হয়ে গেছে, সেখানে পুনরুদ্ধার করাও সামাজিক ও বাস্তবিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।
তাহলে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
এই বাস্তবতায় মনে হয়, খাল খননের আগে কিছু মৌলিক বিষয়ের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
১. নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার।
২. খাল-নদীর প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃস্থাপন।
৩. পানিপ্রবাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
৪. অবৈধ দখল ও ভরাট নিয়ন্ত্রণ।
কারণ, নদী যদি বেঁচে না থাকে, খালও বাঁচবে না।
শেষ কথা
আজ প্রশ্নটা শুধু একটি খাল বা একটি গ্রামের নয়, প্রশ্নটা পুরো দেশের জলব্যবস্থার—আমরা কি আমাদের নদীগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারব? খাল খনন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অংশ নাকি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ? আমাদের কৃষি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পানির উৎস কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? পদ্মা, মেঘনা, যমুনা—এসব নদীর প্রবাহ কত দিন এভাবে টিকে থাকবে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া এখন সময়ের দাবি।
রেজা খান: বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ