লামায় দেখা দুই ফুল
আমাদের বন, পাহাড় বা প্রাকৃতিক স্থানগুলো রত্নভান্ডারের মতো। এসব রত্নভান্ডার থেকে মণিমানিক্য কুড়িয়ে হৃদয়ে ধারণ করাই আমার নেশা। ভালোবাসার এই কাজ চলমান। পাহাড় থেকে হাওর, হাওর থেকে বিল, বিল থেকে বনেÑছুটছি নিরন্তর। এভাবেই ছুটতে ছুটতে একদিন উপস্থিত হই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বান্দরবানের লামায়। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে সেখানকার কোয়ান্টামে। প্রতিষ্ঠানটির একদল তরুণ পরিবেশকর্মী কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে চারপাশের আধখাওয়া ন্যাড়া পাহাড়কে আবার সবুজ করে তুলেছেন। স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের সঙ্গে তাঁরা যোগ করেছেন হারিয়ে যাওয়া প্রজাতিগুলোকেও। এভাবেই ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠেছে চমৎকার এক উদ্ভিদরাজ্য। আর দশটি স্থানের মতো এখানেও কতবার যে হানা দিয়েছি, তার কোনো ঠিক নেই। প্রতিবারই কোনো না কোনো অচেনা গাছের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ফলে উদ্ভিদ-অভিজ্ঞতার ঝুলি ফুলেফেঁপে হয়েছে টইটম্বুর। সেসব উদ্ভিদেরই দুটি সম্পর্কে বলব এখন।
গরু-মারা বা নিশাম্বা
ডিসেম্বর মাস। কোয়ান্টামের শৈলসারির পরতে পরতে শীতের আমেজ। বহুমাত্রিক কাজের এই প্রতিষ্ঠানের নানান কার্যক্রম বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। সেসবই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। পথ চলতে চোখ-কান খোলা রাখি—যদি নতুন কিছুর সন্ধান পাই! আবাসিক এলাকা থেকে হারবেরিয়াম ঘরে যাওয়ার পথে চোখ আটকে গেল একগুচ্ছ ফুলে। শীতকালে আমাদের দেশে বড় গাছে ফুলের সংখ্যা কম থাকে। শীতের এই দৈন্য ঘোচাতেই সম্ভবত ফুলটি তার সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। গাছটির স্থানীয় নাম গরু-মারা বা নিশাম্বা। দেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিৎ অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও সংখ্যায় অনেক কম।
নিশাম্বা (Crypteronia paniculata) বড় বৃক্ষ, ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড ডিম্বাকার, বিস্তৃত; বাকল ধূসর বা বাদামি, ভেতরটা লালাভ বাদামি। পাতা প্রতিমুখ, ৬ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা, পুরু ও গাঢ় সবুজ। ছড়ার মতো ফুলগুলো শাখার প্রান্তে গুচ্ছাকারে ঝুলে থাকে। ফুল সবুজাভ সাদা, আড়াআড়ি তিন সেন্টিমিটার, পুষ্পবৃন্ত দুই মিলিমিটার লম্বা, মঞ্জরিপত্র এক মিলিমিটার লম্বা, রৈখিক ও রোমশ। বৃতিনল খাটো, এক মিলিমিটার লম্বা। পাপড়ি অনুপস্থিত। পুংকেশর দুই মিলিমিটার লম্বা। ফুল ও ফলের মৌসুম নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই গাছের কাঠ লালচে বাদামি, ভারী ও শক্ত। গাড়ির চাকা, রেলের স্লিপার ও বাড়ি নির্মাণের সরঞ্জাম হিসেবেও কাজে লাগে। কচিপাতার স্বাদ তেতো। ইন্দোনেশিয়ায় সুগন্ধের জন্য এই পাতা ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। প্রজাতিটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বনের ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে মূল্যবান পরিবেশগত উপাদান হিসেবে কাজ করে। অরণ্য উচ্ছেদ ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বর্তমানে গাছটি বিপন্ন।
হলদে রঙের দোলনচাঁপা
উদ্ভিদসেবার অংশ হিসেবে কোয়ান্টাম প্রাঙ্গণে বিরল উদ্ভিদের একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানেই দেখা পেলাম এই ফুলের। আগে কোথাও দেখিনি। দোলনচাঁপা আমাদের দেশে সহজলভ্য হলেও নিকটাত্মীয়া হিসেবে এখানকার উদ্যানে এই গাছেরও অভিষেক হলো। বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় গাছটির নাম হলদে দোলনচাঁপা হতে পারে। গাছের উচ্চতা, পাতার গড়ন ও মঞ্জরির বৈশিষ্ট্য দেখে প্রথমেই দোলনচাঁপার কথা মনে হলো। অমিল শুধু ফুলের রঙে। ২০২২ সালে গাছটি এখানে রোপণ করেন প্রকৃতিপ্রেমী সাইফুদ্দিন সাইফ। কন্দজ এই গাছ হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও আমাদের দেশে আগে ছিল না। গাছটি পূর্ব হিমালয়ে ১২০০ থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতায় পাওয়া যায়। ইংরেজিতে ‘ক্রিম গারলেন্ড লিলি’ বা ‘ইয়েলো জিনজার’ নামে পরিচিত।
কন্দজ ও পাতাযুক্ত কাণ্ডের এই গাছ (Hedychium flavescens) বহুবর্ষজীবী, দেড় থেকে দুই মিটার লম্বা। কন্দ তিন সেন্টিমিটার ব্যাস, শাখাযুক্ত, অভ্যন্তরীণভাবে ফ্যাকাশে ও সুগন্ধযুক্ত। পাতা আয়তাকার থেকে বর্শা আকৃতির, ২০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল সুগন্ধি ও হলুদ। ফুলের নল সরু, ৮ থেকে ৯ সেন্টিমিটার লম্বা, পাপড়ি রৈখিক, বর্শা আকৃতির, ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। ঠোঁট প্রায়ই কেন্দ্রীয়ভাবে গাঢ় হলুদ। পুংকেশর হলুদ, ঠোঁটের প্রায় সমান লম্বা। ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর মাস। এই গাছ হিমালয় ছাড়াও উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, মরিশাস, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। নিউজিল্যান্ডে এই গাছ আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হয়।