উদয়ী টিকাশাহিন দেখার গল্প 

উদয়ী টিকাশাহিন। সম্প্রতি বান্দরবানের ক্রিসতং থেকে তোলা
ছবি: সাহাদ রাজু

অক্টোবরের শেষভাগে সামান্য শীতের আমেজ পড়তে শুরু করেছে। বিখ্যাত স্কটিশ পাখিবিজ্ঞানী ডানকান ইউইংয়ের সঙ্গে খুব সকালে পাখি দেখতে বের হয়েছি সাতছড়ির বনে। এই বনের পাশেই ডানকান ব্রাদার্সের সুন্দর পরিপাটি চা–বাগান।

প্রায় পাঁচ দিন ধরে এই চা–বাগানের ভেতর দিয়ে খুব সকাল সকাল যাচ্ছি রেমা বনে পাখি সংরক্ষণের কাজে। রাতযাপন করছি সাতছড়ির ফরেস্ট বাংলোতে। এখানকার একটি উঁচু টাওয়ার পাখি দেখার জন্য খুব চমৎকার। এত কাছে থেকে এক সকালে টাওয়ারে পাখি দেখতে যাব না, তা হতেই পারে না। ২০ অক্টোবর মাত্র আধা ঘণ্টার জন্য টাওয়ারে গেলাম পাখি দেখতে। ডানকান খুব খুশি হলো। বেশ কয়েক জাতের পাখি দেখলাম। এমনকি তার জন্য দুই জাতের একেবারেই নতুন পাখি ছিল। পাখি দেখার সময়টায় হঠাৎ করেই ডানকান বলে উঠল ওরিয়েন্টাল হবি। একেবারেই অবাক হলাম! এর আগে এই অঞ্চল থেকে পাখিটি দেখার আর কোনো তথ্যই নেই। বিরল এই পাখি সাতছড়ি টাওয়ারে এসে দেখব, তা ভাবতেই পারিনি।

ওরিয়েন্টাল হবি বা উদয়ী টিকাশাহিন পরিবারের সব প্রজাতিই মাঠে দেখা আমি দারুণ উপভোগ করি। আর ওরিয়েন্টাল হবি দেখার শখ আমার সব সময়ের। প্রথমবার দেখি ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে পাবলাখালী অভয়ারণ্যে। সেদিন সারা দিন ধরে উঁচু পাহাড় ধরে পাখি দেখছিলাম। এভাবে পাখি দেখা সত্যিই অনেক কষ্টের। খুব ভোর থেকে প্রায় বিকেল অবধি বেশ কিছু পাখির দেখা পেয়েছিলাম। কিন্তু সব পাখি প্রজাতিই ছিল চেনা।

শেষ বিকেলে প্রায় ৪০ মিটার লম্বা একটি গাছে দূর পাহাড়ে বাইনোকুলারে একটি পাখি খুঁজে পেলাম। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল প্রেরগ্রিন শাহিন। কিন্তু ছবি মিলিয়ে পরে দেখলাম ওরিয়েন্টাল হবি। সারা দিনের ক্লান্তি একনিমেষেই শেষ হয়ে গেল। কারণ, বাংলাদেশের পাখির তালিকায় এটি ছিল নতুন পাখি। সে বছর এই পাখি নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধও প্রকাশিত হলো ব্রিটিশ সাময়িকী বার্ডিং এশিয়াতে।

উদয়ী টিকাশাহিন এরপর আরও কয়েকবার দেখা গেছে। সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে ভালো ছবি তুলেছেন সাহাদ রাজু বান্দরবানের ক্রিসতং অঞ্চল থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ওই এলাকায় পরপর তিন বছরের ধরে বেশ কয়েকবার এই পাখি দেখা গেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ওই এলাকা থেকে পাখিটির একটি বাসাও পাওয়া গেছে। এর আগে আমরা জানতাম পাখিটি ইতস্তত ভ্রমণকারী পাখি বা পরিযায়ী পাখি। এখন আমাদের আবাসিক পাখির তালিকায় পাখিটির নাম এসেছে। 

বিরল উদয়ী টিকাশাহিনের দেখা মেলে ইন্দোমালয় অঞ্চলে। তবে সংখ্যায় খুব বেশি কখনোই দেখা যায় না। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায় এর উপস্থিতি আছে, তবে বেশ কম। ইউরেশীয় হবির সঙ্গে পাখিটির মিল থাকায় তাকে চেনা খুব মুশকিল। এর ওড়ার ধরন আর গায়ের রঙের পার্থক্য দেখে একে চিনতে হয়। এই পুরো অঞ্চলটিতেই পাখিটির সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের তেমন ধারণা নেই। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে পাখিটি নিয়মিতই প্রজনন করে।

বাংলাদেশে ফালকিনিডি ও শাহিন পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৯। এর মধ্যে সবচেয়ে বিরল প্রজাতি হলো উদয়ী টিকাশাহিন। বেশির ভাগ প্রজাতিই পরিযায়ী। সবচেয়ে নিয়মিত বাসা বানিয়ে বাচ্চা ফোটায় লালঘাড় শাহিন। ঢাকা শহরেও এই প্রজাতির পাখিকে বাচ্চা ফোটাতে দেখা যায়। কিন্তু উদয়ী শাহিনের ক্ষেত্রে বাসা বানিয়ে বাচ্চা ফোটানোর তথ্য পাওয়া গেছে শুধু ওই একবারই।

 উদয়ী টিকাশাহিনের উড়ে চলা আর শিকার ধরায় দারুণ গতি আছে। পাখিটিকে নিয়মিত দেখার আশায় থাকি।