অপরূপ রাঙাচ্যাগার খোঁজে
রাঙাচ্যাগা পাখিটি প্রথম দেখি রংপুরের কারমাইকেল কলেজসংলগ্ন একটি বিলে। সামান্য সময়ের জন্য। সে–ও অনেক দূর থেকে। ক্যামেরা সঙ্গে থাকলেও শীতের পড়ন্ত বিকেলে ভালো ছবি পাইনি। বছর পাঁচেক আগের কথা। এরপর, তা–ও বছর চার হবে, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় নান্দিয়ার বিলে দেখেছি রাঙাচ্যাগা। সেখানে আরও কম সময় দেখতে পেয়েছি। দেখামাত্রই উড়াল দিয়েছে।
আবাসিক পাখি রাঙাচ্যাগা খোঁজার জন্য কারমাইকেল কলেজের বিলে এবং বদরগঞ্জে অনেকবার গিয়েছি, আর দেখা পাইনি। সম্প্রতি পাখি আলোকচিত্রী রাকিন জহিরকে বলছিলাম, চলো রাঙাচ্যাগা খুঁজি। শুনেই সে জানাল রংপুরের উপকণ্ঠে দর্শনা মোড়ে একটি নিম্নাঞ্চলে অনেকগুলো রাঙাচ্যাগা সে দেখেছে।
২০২৫ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর দুজনে সেখানে গেলাম। খুব যে নিম্নাঞ্চল, তা–ও নয়। পানি শুকিয়ে গেছে। ধান চাষ করার জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। ঘণ্টা দুয়েক দাঁড়িয়ে থেকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে গেলাম সেদিন। রাকিন জহির কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখতে পেয়েছিল একটিকে।
রংপুরে ঘন কুয়াশার কারণে রাঙাচ্যাগা খুঁজতে যাওয়া হচ্ছিল না। এরই মধ্যে একদিন দুপুরে একচিলতে রোদ। শীতকালীন ছুটিতে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ও। নতুন পাখি আলোকচিত্রী খাইরুল ইসলাম পলাশসহ ওই নিম্নাঞ্চলে গেলাম রাঙাচ্যাগার সন্ধানে। অনেক সময় অপেক্ষা করেও একটি পাখি দেখতে পাইনি। ফিরে যাওয়ার সময়ে একটি ধানখেতের নাড়া থেকে ফুড়ুৎ করে দুটি রাঙাচ্যাগা উড়ে গিয়ে সামনে নিচু জমিতে পড়ে। প্রচণ্ড শীত–কুয়াশায় হাঁটু পরিমাণ কাদায় নেমে শেষ বিকেলের চেষ্টায় একটুখানি রাঙাচ্যাগা দেখার সুযোগ হয়। সেদিন বেশ কয়েকটি রাঙাচ্যাগা দেখেছি।
৭ জানুয়ারি একটু রোদ উঠেছিল। আবারও সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম অন্তত শখানেক রাঙাচ্যাগা। কিন্তু সব ধানের নাড়ার আড়ালে, নয়তো চাষ করা শুকনো জমিতে দূরে। আবারও হাঁটু পরিমাণ কাদায় নেমে ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। একসময় দেখলাম খুব কাছে বসে আছে। উড়েও যাচ্ছে না। মনমতো ছবি তুললাম। মনভরে দেখাও হলো।
রাঙাচ্যাগার আচরণ দেখে একেবার মনে হয় খুব লাজুক পাখি। মানুষকে ভয় করে এমনটাও মনে হয় না। তবে খুব সতর্ক। যেহেতু নিজেকে খুব দ্রুত আড়াল করে নিতে পারে, তাই সহজে কেউ তাকে খুঁজে পায় না। এদের লুকিয়ে থাকাটাও দারুণ। একবার জঙ্গলবিহীন খোলা জায়গায় একটি রাঙাচ্যাগা বসেছিল। পাশ দিয়ে একজনকে হেঁটে যেতে দেখে পাখিটি পানিতে এমনভাবে মাথা-ঠোঁট নিচু করে শরীর অনেকখানি ডুবিয়ে রাখল যে বোঝার উপায় নেই সেখানে একটি পাখি আছে। আরেকবার দেখলাম কয়েকটি রাঙাচ্যাগা একটি স্থানে জমির শেষ প্রান্তে উঁচু আলের সঙ্গে পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। এটাও আত্মগোপনের কৌশল। পাখির ছবি তুলে ফেরার সময় স্থানীয় একজন দেখতে চাইলেন কোন পাখির ছবি তুললাম। ক্যামেরায় দেখাতেই একজন বললেন, এ পাখি তো মাটিতে ডিম দেয়। সেখানে বাচ্চা হয়। তারা এই পাখিটির সঙ্গে পরিচিত। যে রাঙাচ্যাগা পাখি অনেক দিন ধরে খুঁজি, সেই পাখি যে রংপুর শহরের উপকণ্ঠে বিশাল দলে–বলে আছে, জানাই ছিল না।
রাঙাচ্যাগা পুরুষ পাখি এবং স্ত্রী পাখি দুটোই দেখতে সুন্দর। কেউ হয়তো বলবেন পুরুষ পাখি সুন্দর, কেউ বলবেন স্ত্রী পাখি। পুরুষ পাখি-স্ত্রী পাখির আকৃতি কিংবা ধরন অভিন্ন। ভিন্নতা শুধু রঙে। স্ত্রী পাখিটির ঠোঁট লম্বা এবং কমলা রঙের। চোখের চারদিকে সাদা রং আছে। সাদা রঙে একটি রেখা চোখ থেকে ঘাড়ের দিকেও চলে গেছে। পিঠের পালক ধূসর-সবুজাভ। পাখার প্রান্তের দিকে অনিন্দ্য কারুকাজ। ওড়ার সময়ে পূর্ণরূপে দৃশ্যমান হয়। পুরুষ পাখির পালকও কারুকাজখচিত। পুরুষ পাখির ঠোঁট এবং চোখের চারদিকের রং একই। চোখের চারদিকে উজ্জ্বল বাদামি। পালক বাদামির সঙ্গে ধূসর-কালোর মিশেল। প্রধানত বাদামি রঙের। উভয়ের পেটের দিকে সাদা। রাঙাচ্যাগার ইংরেজি নাম গ্রেটার পেইন্টেড স্নাইপ। বৈজ্ঞানিক নাম Rostratula benghalensis.
রংপুরে নগরায়ণ যেভাবে বাড়ছে, জানি না কত দিন এ পাখিগুলো সেখানে টিকে থাকবে। শীতকালে সারা দেশে কমবেশি দেখা যায়।
তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর