গত ৬ মার্চ আমারই গ্রামের খালপাড়ের একটি কালভার্টের ওপরে বসে বিকেলে মজার দৃশ্যটা দেখি আমরা কজন মিলে। উপস্থিত সবাই তো বটেই, গ্রামবাংলার প্রায় সব মানুষই চেনে এই ছোট সুন্দর পাখিটিকে, বহু মানুষই দেখেছেন এদের মাটিতে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কৌশল। ধেনো ইঁদুর যে কৌশলে ধানখেতে বা অন্য কোথাও সুড়ঙ্গ খোঁড়ে, হুবহু একই কৌশলে সুইচোরারা সুড়ঙ্গ খোঁড়ে। প্রথমে দুটিতে মিলে জুতসই জায়গা নির্বাচন করে। তারপর ঠোঁট দিয়ে গর্তমুখ তৈরি করে। যতই ভেতরে যাবে, ততই বাড়বে খাটুনি। ভেতরের মাটি বুক-পেট ও ঠোঁট দিয়ে ঠেলে ঠেলে বাইরে এনে ফেলবে। গর্তমুখ বা প্রবেশপথটার বেড় এতটুকুই রাখবে, যাতে নিজেরা কষ্টেসৃষ্টে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, দাঁড়াশ সাপ-গুইসাপ-বেজি ও দাঁড়কাক-হাঁড়িচাঁচা-কুকো পাখিরা সহজে সুড়ঙ্গের ভেতরে হামলা চালাতে না পারে।

ফুর্তিবাজ, খোলা মাঠ-প্রান্তরের বাসিন্দা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির ও সুরেলা-মিষ্টি কণ্ঠের সুইচোরা পাখিরা আছে বাংলাদেশজুড়ে। উড়ন্ত শিকার চোখে পড়লেই শিল্পিত ভঙ্গিতে সরলরেখায় উড়ে গিয়ে ‘চটাস’ শব্দে শিকারকে দুই ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে বসবে আবার আগের জায়গায় এসে। পোকাটি যদি বড় হয় ও নড়াচড়া করে, তাহলে মাছরাঙাদের মতো বসা ডালের এপাশে-ওপাশে আছড়াবে, মেরে ফেলবে, তারপর গিলবে। এদের ওড়ার ভঙ্গিটা খুবই সুন্দর। ঝাঁক বেঁধে উড়লে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়। সম্মিলিত কণ্ঠের সুরেলা গানও উপভোগ করার মতো। নিছক খেলায় মেতে এরা যখন শূন্যে ওড়াউড়ি ও ঘোরাঘুরি করে, তখন নানা রকম ডিসপ্লে যেন দেখা যায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট এই সুইচোরার ইংরেজি নাম এশিয়ান গ্রিন বি–ইটার। বৈজ্ঞানিক নাম Merops orientalis. দৈর্ঘ্যে ঠোঁটের অগ্রভাগ থেকে লেজ ও লেজের মধ্যভাগ থেকে লম্বা সুইসদৃশ পালকসহ ২১ সেন্টিমিটার। লেজের গোড়াসহ সুই পালকের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক শূন্য ৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ লেজের দৈর্ঘ্যই বেশি। একনজরে সবুজ রঙের চঞ্চল স্বভাবের এই পাখির চোখের ওপর দিয়ে যেন কাজলটানা। মাথার তালু ও ঘাড় সোনালি। লালচে চিবুক। ঠোঁট-পা কালো। পাখিটির নাম সুইচোরা ছাড়াও বাঁশপাতি, সুইকাটা, সুইপাখি নামেও পরিচিতি। এদের সুচালো-বক্র ঠোঁটটি যে সুইয়ের মতোই ধারালো, তা যাঁরা ঠোকর খেয়েছেন, তাঁরাই জানেন ভালোভাবে। যাযাবরদের মতো স্বভাব এদের। এক এলাকায় বেশি দিন থাকে না।

শরীফ খান, পাখি ও বন্য প্রাণিবিষয়ক লেখক

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন