বাজেটে পরিবেশ ও জলবায়ু: উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, অর্থায়নে অস্পষ্টতা

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের গভীরতা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অধীনে প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর মোকাবিলায় যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তা অপ্রতুল বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বায়ুদূষণ রাজধানীসহ সারা দেশেরই বড় পরিবেশগত সমস্যা। এর নিয়ন্ত্রণে সঠিক পরিকল্পনার অভাবের কথাও বলছেন গবেষকেরা।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা বলা ছিল, তার অনেক কিছুরই প্রতিফলন বাজেটে দেখা গেছে। যেমন ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সাড়ে তিন লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’ ও ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’–এর মতো উদ্যোগ এসেছে। গাছ রোপণ পর্যবেক্ষণে অ্যাপ ব্যবহার, প্লাস্টিক–দূষণ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবও রয়েছে। প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে ‘থ্রি আর’—রিডিউস, রিইউজ ও রিপারপাজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়কে ইতিবাচক বলছেন পরিবেশ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্। তিনি আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ বাজেটে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা অংশটি পড়ে একটি ইতিবাচক প্রবণতা চোখে পড়েছে। সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করছে—এটি একটি সুলক্ষণ। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনুত্তরিত থেকে গেছে।

হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্ বলেন, প্রথমত, অর্থায়নের উৎস স্পষ্ট নয়। এত বড় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অর্থ কোথা থেকে আসবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এ অধ্যায়ে পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে বরাদ্দ মাত্র ১০০ কোটি টাকা, যা হতাশাজনক। মোট বাজেট এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা ১৫–১৭ বছর আগের তুলনায় আট গুণের বেশি। অথচ ট্রাস্ট ফান্ডের বরাদ্দ সেই তুলনায় কার্যত অপরিবর্তিত। বিশেষত যখন সরকার নিজেই বলছে বাংলাদেশে প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যে সামগ্রিক পরিকল্পনা আছে তা যদি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে প্রতিবছর তার প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার দরকার। তখন এই বরাদ্দ সংগতিপূর্ণ নয়।

তৃতীয়ত, প্লাস্টিক–দূষণ কমাতে বিকল্পের (রিপ্লেসমেন্ট) প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বাস্তবে মানুষ প্লাস্টিক ব্যবহার করে, কারণ সাশ্রয়ী বিকল্প নেই। ব্যবহার কমানোর আহ্বান কার্যকর হবে না, যদি না সেই বিকল্প নিশ্চিত করা যায়।

চতুর্থত, কার্বন ট্রেডিং নিয়ে উচ্চাভিলাষী কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এখনো সীমিত। তাই বিষয়টি উৎসাহব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।

হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্ বলেন, সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ও জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নে সরকার মোট কত অর্থ বরাদ্দ করতে চায়, সেই সামগ্রিক চিত্রটি বাজেটে অনুপস্থিত। লক্ষ্যমাত্রা আছে, সংকল্প আছে, কিন্তু সেগুলো পূরণের আর্থিক রোডম্যাপ নেই।