তখন সাফারির মানে ছিল বনে তাঁবু গেড়ে কিছুদিনের জন্য বসবাস করা, গাছে মাচান বেঁধে প্রাণী এবং পরবর্তীকালে যন্ত্রচালিত গাড়িতে করে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করা। প্রাণীদের বাসস্থানে গিয়ে পরিমিত দূরত্ব রেখে প্রাণী পর্যবেক্ষণ, ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা বা নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার কর্মসূচি জনপ্রিয় হতে থাকে। আস্তে আস্তে সাফারির এই ধারণা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়।

দর্শকদের জন্য আফ্রিকায় মূল সাফারি পরিচালিত হয় শুধু বিভিন্ন দেশের সরকার ঘোষিত বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান, সংরক্ষিত বন, জলাভূমি, সৈকত, নদী ও সমুদ্রসীমানার মেরিন পার্কগুলোয়। এ ছাড়া মহাদেশটিতে অনেক ব্যক্তি, সমিতি বা এনজিও মালিকানায় ৫ থেকে ২০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বন্য প্রাণীর খামার এবং অভয়ারণ্য বা সাফারি পার্ক আছে। সেখানে টাকার বিনিময়ে শুধু সাফারিই পরিচালিত হয় না, খামারে বন্দী বা প্রজনন করা বন্য প্রাণী গুলি করে মেরে সে ট্রফি নিজ নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার বৈশ্বিক অনুমতিও পাওয়া যায়।

তবে আফ্রিকা মহাদেশের বন্য প্রাণীর সাফারি পরিচালিত হয় মূলত সরকার ঘোষিত প্রাকৃতিক বন বা বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্যে। সেখানে বন্য প্রাণীরা তাদের আরণ্য জীবনযাত্রা রুটিন অব্যাহত রাখে। তাদের আরণ্যক পরিবেশে দেখার জন্য বনের ভেতরে প্রকৃতিকে বিঘ্নিত না করে পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে ভ্রমণেচ্ছুদের জন্য বিশেষ ধরনের তাঁবুঘর বা ইকো–কটেজ তৈরি করা হয়।

ভ্রমণেচ্ছুদের বিশেষভাবে তৈরি যানে করে অভয়ারণ্যের বিশেষ এলাকা দিয়ে পরিচালিত ট্রেইল ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে পাকা রাস্তা বা দালান তৈরি করা হয় না। গাড়িতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পরিচালক বা গাইড থাকে। তারা ধারাবর্ণনা যেমন দেয়, তেমনই লক্ষ্য রাখে, যাতে বন্য প্রাণীদের জীবনযাত্রায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আফ্রিকার প্রাকৃতিক সাফারি পার্কে দর্শকের কাছাকাছি আনার জন্য কোনো প্রাণীকে খাবার দেওয়া যায় না। সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা এসব সাফারি পার্কে কোনো ভিনদেশি প্রাণীও রাখা হয় না।

সাফারির মূল কথা হলো বন্য প্রাণীরা নিজের ভুবনে আপনমনে ঘুরে বেড়াবে। তারা হবে স্বাধীন। দর্শক থাকবে খাঁচাসদৃশ গাড়িতে বন্দী! এটি চিড়িয়াখানা ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সাফারি পার্কের যাত্রা

ধরে নেওয়া হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার জাতীয় উদ্যানে ১৯২০ সালে প্রথমবারের মতো যানবাহনে করে পর্যটকদেরকে পার্কের চিহ্নিত বিশেষ ট্রেইল ধরে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়। পরে পার্কের ভেতরে রাত কাটানোর জন্য ‘প্রিটোরিয়া স্কপ রেস্ট ক্যাম্প’ নামে একটি সরাইখানা চালু করে। এখন অবশ্য ক্রুগার জাতীয় উদ্যানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খোলনলচে বদলে সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী করা হয়েছে।

আফ্রিকার অনুরূপ কোনো সাফারি পার্ক দক্ষিণ এশিয়ায় নেই। ভারতে বন্য প্রাণীর প্রথম জাতীয় উদ্যানের সূচনা ব্রিটিশ আমলে। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা বর্তমান উত্তরাখন্ডের নৈনিতালে এক নদীবেষ্টিত পাহাড়ি বনরাজিকে ‘হেইলি জাতীয় উদ্যান’ বলে ঘোষণা করে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার প্রায় এক দশক পর এর নতুন নাম হয় করবেট জাতীয় উদ্যান। ১৯৭৩ সাল থেকে এটাই ভারতের প্রথম টাইগার রিজার্ভ।

ভারতে এখন আছে ১০৪টি জাতীয় উদ্যান, ৫৫১টি বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, ১৩১টি মেরিন পার্ক, ১৮টি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ এবং ১২৭টি কমিউনিটি রিজার্ভ। এগুলোর আয়তন ১,৬৫,০৮৮ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট এলাকার ৫.০৬ শতাংশ, বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়েও বড়।

ভারতীয় জাতীয় উদ্যান বা বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা আফ্রিকার, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার তুলনায় খুবই দুর্বল। এগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ ভারতে সংকুচিত, আফ্রিকায় যা অবিচ্ছেদ্য। ভারতে ব্রিটিশের তৈরি যে বন বিভাগ এর দায়িত্বে আছে, তারা রাজকীয় চালে চলতে পছন্দ করে। ব্যবস্থাপনা পুলিশি কায়দার। এর প্রকট প্রতিফলন দেখা যাবে আমাদের দেশেও।

এরপরও ভারতের বন্য প্রাণীর সংরক্ষিত ভূমি বিশাল এবং সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিরামিষাশী বলে প্রাণী হত্যায় আমজনতার উৎসাহ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া বন্য প্রাণী সংরক্ষিত এলাকায় মানুষের উপদ্রব খুব কম এবং ভারতীয় অনেক সম্প্রদায় প্রাণীকে দেবতা হিসেবে মানে। এ কারণে বন্য প্রাণীদের জন্য পরিস্থিতিটি সেখানে ততটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি।

এরপরও ভারতে বা এশিয়ায় আফ্রিকার মতো সাভানা–জাতীয় নিষ্পাদপ প্রান্তর নেই বলে ডজন ডজন প্রাণীর কাফেলা বা শত শত বা হাজার হাজার প্রাণীর কোনো দলবদ্ধ বিচরণের দৃশ্য চোখে পড়ে না। ভারতে আসামের কাজিরাঙায় ক্বচিৎ শতাধিক হরিণ, বুনো মোষ, শূকর, গন্ডার বা হাতির পাল ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। অন্যত্র হয়তো চিত্রাহরিণ, কৃষ্ণষাঁড়, হাতি বা বনগরুর এক প্রজাতির কিছুটা বড় দল দেখা যেতে পারে।

ভারতে দুই ধরনের সাফারি হয়। প্রথমটি হলো কোনো কোনো রাজ্যে সরকার ঘোষিত জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য বা টাইগার রিজার্ভে সরকার বা ঠিকাদার পরিচালিত ব্যবস্থাপনায় টাকার বিনিময়ে কেবল সুরক্ষিত উপযোগী বাহনে বিশেষ মৌসুমে বা দিনের বিশেষ সময়ে নির্দিষ্টসংখ্যক দর্শক প্রাকৃতিক বন ঘুরিয়ে দেখানো হয়। বন্য প্রাণীকে বাইরের কোনো খাদ্য পরিবেশন করা হয় না। বনের গভীরে পানিসংকটের কারণে কোথাও কোথাও মাটির সমান উচ্চতায় চৌবাচ্চা বানানো হয়। সেগুলো প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। পানির অভাব হলে এগুলোতে পানি পরিবেশন করা হয়। এসব সাফারিতে প্রাণীর দর্শন শতভাগ নিশ্চিত নয়।

দ্বিতীয় ধরনের সাফারিতে সরকারি বা বেসরকারি কোনো জমির পুরোটাকে তারের জালে বা প্রাচীরে ঘিরে ফেলা হয়। এসব এলাকা এক থেকে শতাধিক বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এরপর যে প্রজাতি ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রাণীর জন্য বিভিন্ন আয়তনের এলাকাকে প্রয়োজনীয় উচ্চতার ঘের দিয়ে ভাগ ভাগ করা হয়। বানানো হয় বিভিন্ন ধরনের ট্রেইল। তৈরি করা হয় পানি ও খাবার পরিবেশনের জায়গা। প্রাকৃতিকভাবে যথেষ্ট গাছপালা না থাকলে গাছপালা রোপণ করা হয়। কোনো কোনো সাফারিতে প্রাণীদের ঘুমানোর বা বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্য কিছু স্থাপনাও তৈরি করা হয়। এরপর জায়গামতো প্রাণীদের জোড়ায় জোড়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। হরিণ, সাম্বার বা নীলগাইয়ের মতো খুরেলা প্রাণীদের একই ঘেরে মিলিয়ে মিশিয়েও রাখা হয়।

সাধারণত হাতি, বাঘ ও ভালুকের মতো আক্রমণাত্মক প্রাণী ছাড়া বাকিদের ঘেরের ভেতর দিয়ে দর্শকবাহী গাড়ি চলাচলের পথ থাকে। ভারতের বেশির ভাগ সাফারিতে চিড়িয়াখানার বা উদ্ধার করা প্রাণী প্রদর্শন করা হয় বলে এদের ঘেরের ভেতরেও দর্শকবাহী গাড়ির পথ থাকে।

চিড়িয়াখানা আর সাফারিতে এসব প্রাণী প্রদর্শনের মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই। সাফারিতে দর্শক কেবল না হেঁটে গাড়িতে চড়ে প্রাণী দেখে।

ভারতে সরকার ঘোষিত জাতীয় বন, অভয়ারণ্য বা বাঘ সংরক্ষণকারী বনেই কেবল আফ্রিকার ধরনে সাফারি পরিচালিত হয়ে থাকে। মানবসৃষ্ট বাকি সাফারিগুলো আসলে বড় পরিসরে বন্দী প্রাণী প্রদর্শনেরই শামিল, যার ব্যবস্থাপনা প্রায় চিড়িয়াখানার কাছাকাছি। ভারতে পদাধিকারবলে সরকারি চিড়িয়াখানাগুলোর ব্যবস্থাপনাপ্রধান থাকেন বন বিভাগের ডিএফও বা কনজারভেটর।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা

আফ্রিকা বা ভারতের মতো বেষ্টনীবিহীন সংরক্ষিত বনের ভেতরে সাফারির ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে একটিও নেই। কেবল সুন্দরবন কিছুটা ব্যতিক্রমী। তবে সেখানে কোনো সাফারি নেই, তার কোনো প্রয়োজনও নেই। এখানে অরক্ষিত ও অসংযোজিতভাবে পরিচালিত লঞ্চ বা নৌকায় পর্যটকেরা বনের পাশে বা নদীর চরে চিত্রাহরিণ ও বানরের দল দেখতে পান। বিরলভাবে দেখা মেলে নোনাপানির কুমিরের। ভাগ্য অসম্ভব সুপ্রসন্ন হলে বাংলার বাঘের দেখাও মিলতে পারে।

আমাদের দেশে প্রাকৃতিক ভূমিতে সাফারি করার মতো জায়গা আছে কেবল সরকার ঘোষিত বনে। বাংলাদেশে অবশ্য বনের পরিমাণ নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। প্রথম আলো ২০১৮ সালের ১৮ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) চলতি মাসের ৯ জুলাই বনবিষয়ক এক প্রতিবেদনে (দ্য স্টেট অব গ্লোবাল ফরেস্ট-২০১৮) বলেছে, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি। তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এই তথ্য মানতে নারাজ। মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশের মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ বনভূমি (বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা)।’ মজার বিষয় হলো, এফএওর বাংলাদেশ অংশের রিপোর্ট তৈরি হয়েছে অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বন বিভাগের বর্তমান বা সাবেক এক বা একাধিক কর্মীর হাতে। সে বছরের জুলাই মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বন বিভাগের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী প্রতিবেদনটি গ্রহণও করেছেন।

বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফও) এবং ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) গত ২৭ জুন প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে বলছিল, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে।

সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী মনে করেন, প্রতিবেদনে পরিবেশিত তথ্য সঠিক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নামেই প্রায় দুই লাখ হেক্টর বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগ চট্টগ্রাম বিভাগে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকেরা বন সংরক্ষণের বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন না করে আবাসন থেকে শুরু করে নানা প্রকল্পে বনের জমি বেশি করে বরাদ্দ দিয়েছেন। এ ছাড়া পার্বত্য চুক্তির পর থেকে সে অঞ্চলে সরকারের কোনো একক সংস্থা বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে না থাকায় পার্বত্য অঞ্চলেও দ্রুত বনভূমি কমছে।

যা হোক, বাংলাদেশে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রায় সব বইয়েই বনের পরিমাণ বন বিভাগের দাবি করা বনভূমির চেয়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কম দেখানো হয়েছে।

১৯৬৭ সাল থেকে আমি সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বনে গবেষণার কাজে যেতে শুরু করি। সে গবেষণা আজও চলমান। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত আমার প্রথম বই ওয়াইল্ডলাইফ অব বাংলাদেশ–এ আমি উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশের মূল বনভূমির পরিমাণ দেশের মূল জমির মাত্র ৭ শতাংশ। তথ্যটি নিয়েছিলাম ১৯৮১ সালে বিএডিসির সরকারি প্রকাশনা থেকেই। ভূমি স্যাটেলাইট বিশ্লেষণগুলো পরিবেশগত ভারসাম্যবিন্দুর নিচে মাত্র ৭ শতাংশ বন আছে বলে জানায়। এই বিশ্লেষণ আরও ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের প্লাবনভূমিজুড়ে কখনো বনের অস্তিত্ব ছিল না (ইউএনডিপি/এফএও, ১৯৭১)।

দেশে বনের পরিমাণ নিয়ে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, আফ্রিকা মহাদেশ বা ভারতের আদলে সাফারি পার্ক করার মতো জায়গা আমাদের দেশে নেই। কারণ, কেবল সুন্দরবন বাদে আর কোথাও কোনো প্রাণী দলেবলে বসবাস করে না, যা গাড়িতে চড়িয়ে ঘটা করে পর্যটকদের দেখানো যাবে। আর সুন্দরবনে তা করা যাবে না সারা এলাকা জলাভূমিময় বলে। ওখানে জলযান ছাড়া বিচরণ অসম্ভব। আমাদের এখানে আবার অসচেতন বন বিভাগ বা পর্যটকেরা এর হরিণ ও বানরকে খাবার পরিবেশন করতে থাকে, যা আফ্রিকার দেশগুলোতে বা ভারতে একদম নিষিদ্ধ।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন