এক শ বোতলনাক ডলফিনের দেখা
প্রায় ১০ মিনিট ধরে বাইনোকুলার চোখে ধরে আছি। কোথাও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। চারপাশে শুধুই নীল জলরাশি। এ রকম জলের ভেতর দিয়ে আমাদের জাহাজ ছুটছে গভীর সমুদ্রের দিকে। চারপাশে জনমানুষ তো দূরের কথা, একটি মাছ ধরার নৌকাও নেই। বড় বড় ঢেউ মাড়িয়ে আমরা প্রায় আরও আধা ঘণ্টা চললাম। সুন্দরবনের দুবলার চর থেকেই এরই মধ্যে প্রায় ৭২ মাইল সাগরের ভেতর চলেছি। গভীর সাগরের এই অঞ্চলটির নাম ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। পৃথিবীর গভীরতম স্থানের একটি। এখানে পানির গভীরতা প্রায় ৯০০ মিটার।
শুনেছি, এই এলাকায় সাধারণত জেলেদের মাছ ধরতে আসার কোনো কায়দা নেই। সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ বা বড় ট্রলার দিয়ে যাঁরা মাছ ধরেন, তাঁরাই এ এলাকায় আসেন। এ যাত্রায় আমরা গিয়েছি এই এলাকার জীববৈচিত্র্যের তথ্য সংগ্রহ করতে। বিশেষ করে ডলফিন আর তিমির তথ্য সংগ্রহই আমাদের প্রধান কাজ। দুবলার চর থেকে প্রায় ৬২ কিলোমিটার ভেতর প্রথমেই আমরা দুটি তিমির দেখা পেলাম। এটি ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রাণী। পাঁচ দিনের এই গবেষণাকাজে প্রথমেই যে তিমির দেখা পাব, তা ভাবতেই পারিনি।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের শেষ প্রান্তে অবশেষে একটি নিশানা খুঁজে পেলাম। বাইনোকুলারের মাধ্যমে একটি মাছ ধরা জাহাজ চোখে পড়ল। ক্যাপ্টেনকে অনুরোধ করলাম সেদিকে আমাদের জাহাজ চালাতে। প্রায় ১০ মিনিটের ব্যবধানে মাছ ধরা জাহাজটির কাছাকাছি পৌঁছালাম। এমভি জাগুয়ার নামের এই জাহাজটিতে সবাই তখন বিশাল জাল তুলতে ব্যস্ত। জালের ভেতর একটি ডলফিনের বাচ্চাও আটকা পড়েছে মনে হলো। কাছাকাছি থেকে লক্ষ করলাম, চারপাশে একদল ডলফিন নৌকাটি ঘিরে রেখেছে। সংখ্যায় ৬০–এর বেশি হবে। দেখে মনে হলো এ এলাকার সৈনিক এরা। কোনো ভয়ভীতি নেই।
জেলেরা যখন মাছ ধরার জন্য নৌকায় জাল তোলেন, তখন জাল থেকে অনেক মাছ ফসকে যায়। মূলত এই মাছগুলো খাওয়ার আশায় এই ডলফিনগুলো নৌকাটি ঘিরে রাখে। ডলফিনরা এতে বেশ লাভবান হয়। অনেক সময় ডলফিনের একটি বড় দল একটি বড় মাছের দলকে তাড়া করলে মাছগুলোও জালে আটকা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ডলফিন আর জেলেদের মধ্যে একধরনের অঘোষিত সন্ধি থাকে। কেউ কাউকে খুব বেশি বিরক্ত করে না।
সোয়াচে দেখা এই বড় ডলফিন দলের সব কটিই ছিল ‘বোতলনাক ডলফিন’। ইংরেজিতে বলে ইন্দো-প্যাসিফিক বটলনোজ ডলফিন। গভীর সমুদ্রে সহজেই দেখতে পাওয়া এই ডলফিন আমাদের সোয়াচে বেশ ভালোই আছে। এই সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় এই প্রজাতির ডলফিন আছে প্রায় ২ হাজার ২০০টি। সরকারিভাবে ঘোষিত এই সংরক্ষিত এলাকাটি প্রায় ১ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার।
বোতলনাক ডলফিনের এই দলের সঙ্গে প্রায় ৩০ মিনিট ছিলাম। পুরো সময়টাতে এরা আমাদের খুব ভালো সময় দিয়েছে। জেলেদের জাল তোলা শেষ হলে তারাও গভীর সাগরে মিলে গেল। বোতলনাক ডলফিন নিয়ে জেলেদের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো। জাল তোলার সময় তাঁরা প্রায় প্রতিদিনই এদের দেখা পান। অনেক সময় তাঁদের জালে আটকাও পড়ে ডলফিন। বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দেন। তবে অনেকক্ষণ জালে আটকে থাকলে মারা পড়ে প্রাণীটি। সেগুলোও ছেড়ে দেন সাগরে। অনেক ডলফিনের গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়, যা মূলত মাছ ধরার জালের সঙ্গে আঘাতের কারণেই ঘটে।
দুপুরের খাবার শেষে সেদিন আবার ছুটলাম আরও ভেতরের দিকে। আরেকটি জাহাজের উদ্দেশে। যাওয়ার পথে আবার দেখা পেলাম প্রায় ৪০টি বোতলনাক ডলফিনের। এক দিনেই দেখা পেলাম প্রায় ১০০টি বোতলনাক ডলফিনের। নীলাভ পানির মধ্যে তাদের এই ছুটে চলা সত্যিই অসাধারণ। আমাদের দেশের ভেতর এভাবে কোনো প্রাণীর নির্ভয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলা আমার চোখে আর কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে পড়েনি।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। এখানে সাধারণ মানুষের, এমনকি গবেষকদেরও যাতায়াত কম। খুব ভালো গবেষণা তথ্য–উপাত্তও আমাদের হাতে নেই। গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রায় ১৪ সদস্যের এক বড় গবেষক দল আমরা গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, আইইউসিএন, বন অধিদপ্তর ও জিআইজেডের সমন্বিত এই গবেষক দলকে তাদের জাহাজ দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলেই এই গবেষণাকাজ আমরা করতে পেরেছি। সরকারিভাবে এই এলাকায় আরও বড় ধরনের গবেষণাকাজ পরিচালনা করলে আরও অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কৃত হবে। আর সামুদ্রিক অঞ্চলটিকে আরও সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।
সীমান্ত দীপু, বন্য প্রাণী গবেষক