ফক্স ব্রাশ অর্কিড
‘ফুটছে প্রাচীন ফুল তোমার মনের তলে আনমনা তুমি সন্ধান জানো না।’
—অমিয় চক্রবর্তী
রং–বেরঙের অর্কিড পছন্দ করেন না, এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বিশ্বজুড়ে অর্কিডের আলাদা কদর রয়েছে। জার্মানিতে অবস্থান করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জার্মানরা অর্কিডপ্রেমী। দেশটির ফুলের দোকানগুলোয় বছরজুড়ে বিচিত্র প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। অনেক বাড়ির দেখা মিলবে, যেগুলোর জানালার পাশের ছোট্ট জায়গাটিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বাহারি অর্কিডের গাছ।
জার্মানিতে ঘরে–বাইরে সাজিয়ে রাখা অর্কিডের বেশির ভাগ উষ্ণমণ্ডলীয় প্রজাতির। জার্মানির নিজস্ব প্রজাতির অর্কিডও রয়েছে। তবে এসব অর্কিডের সৌন্দর্য ও রং ততটা আকর্ষণীয় নয়। জানামতে, জার্মানিজুড়ে প্রায় ৬০টি অর্কিড প্রজাতি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত হোয়াইট হেলবর্নি, রেড হেলবর্নি, বি-অর্কিড, বাটারফ্লাই অর্কিডসহ কয়েক প্রজাতির দেখা পেয়েছি।
স্থানীয় অনেক প্রজাতির অর্কিড এখন বিরল ও বিপন্ন। এর অন্যতম কারণ, প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ ক্রমশ কমে আসা এবং ভূমির ব্যবহার বদলে যাওয়া। তবে জার্মানিতে বেশির ভাগ অর্কিডের প্রজাতি পাথুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এ ছাড়া দক্ষিণ জার্মানির ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ তৃণভূমি ও বনাঞ্চলেও অর্কিড বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশেও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অর্কিড। দেশের পাহাড়ি বনে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। এ ছাড়া সমতলে অর্কিডের কিছু প্রজাতির দেখা মেলে। তবে এসব প্রজাতিতে বৈচিত্র্য বেশ কম। যদিও প্রায় প্রতিটি জেলায় শিয়াল–লেজি অর্কিড (Rhynchostylis retusa) চোখে পড়ে।
পাখি সংরক্ষণের কাজে বেশ কয়েকবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় গিয়েছি। সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় সেখানকার গাছপালার প্রজাতিতে ভিন্নতা চোখে পড়েছে। এমন কিছু গাছপালা দেখেছি, যা দেশের অন্যত্র চোখে পড়েনি। তেঁতুলিয়ায় দেখা দুই প্রজাতির অর্কিড আলাদা করে নজর কেড়েছে।
এর একটি ফক্স ব্রাশ অর্কিড (Aerides multiflora)। তেঁতুলিয়ায় এই প্রজাতির অর্কিডের বড় ঝাড় একটি গাছের মোটা কাণ্ডের সঙ্গে প্রথম দেখতে পেয়েছিলাম। প্রায় পুরোটাই ছিল ফুলে আচ্ছাদিত। গোলাপি রঙের সুন্দর ফুল দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। তবে এর বাংলা কোনো নাম জানতে পারিনি।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ছাড়া ফক্স ব্রাশ অর্কিড দেশের আর কোথাও চোখে পড়েনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সিলেটের বনাঞ্চলে এই প্রজাতির অর্কিড থাকলেও থাকতে পারে। কারণ, ভারতের সিকিম, আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে এই প্রজাতির অর্কিড দেখতে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া হিমালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ, নেপাল, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের শুষ্ক নিম্নভূমি, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ফক্স ব্রাশ অর্কিড দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচুতেও এই অর্কিড জন্মায়।
ভারতের কোথাও কোথাও ফক্স ব্রাশ অর্কিডকে বান্দা (মুন্ডা) বা মানা বলা হয়। আসামে একে বলে রাঙা খোঁপা ফুল। বাংলাদেশেও এর কোনো স্থানীয় বা প্রচলিত নাম থাকতে পারে। দেশের বিপন্ন উদ্ভিদের লাল তালিকায় অর্কিডের এই প্রজাতি জায়গা পেয়েছে।
ফক্স ব্রাশ অর্কিড মূলত একটি পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ। এর কাণ্ড শক্ত। একেকটি গাছ ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা লম্বায় ১০ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার। ফুলের পাপড়িতে একই রঙের গাঢ় দাগ দেখা যায়।
ফক্স ব্রাশ অর্কিড ফুলের ঘ্রাণ মনভোলানো। সুঘ্রাণের কারণে মৌমাছি ও বিভিন্ন পোকামাকড় এই ফুলের প্রতি আগ্রহ নিয়ে আসে। এর চারপাশে বিচরণ করে। ফুল ফোটে এপ্রিল–মে মাসে।
এই অর্কিড উজ্জ্বল আলো–সহনশীল। উচ্চ আর্দ্রতায় দ্রুত বেড়ে ওঠে।
সৌরভ মাহমুদ, প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ও পরিবেশবিদ, জার্মান এরোস্পেস সেন্টার