হাম হামের পথে, সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙের খোঁজে

হাম হাম জলপ্রপাতে পাওয়া বিরল প্রজাতির সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙছবি: লেখক

কিছু পথ কেবল হেঁটে অতিক্রম করা যায় না, অতিক্রম করতে হয় সাহস, ধৈর্য এবং নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে। হাম হাম জলপ্রপাতের পথ তেমনই। ৫-৬ কিলোমিটারের দুর্গম পথ, পরপর কয়েকটি পাহাড়ের ওঠানামা, পিচ্ছিল মাটি, পাথুরে ছড়া এবং গভীর অরণ্য পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এই জলপ্রপাতের কাছে।

স্থানীয় ভাষায় পাহাড়ি জলধারাকে ঝিরি বা ছড়া বলা হয়। সেই ছড়ার শেষ প্রান্তেই হাম হাম জলপ্রপাত। পাহাড়ের ৫০–৬০ মিটার উঁচু অংশ থেকে পাথুরে খাদে জলধারা নেমে আসে। পাহাড়ের ওপরই আছে বনভূমি। বর্ষায় এর রূপ গর্জনময় ও উচ্ছল; শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে গেলেও পুরোপুরি থেমে যায় না। পাহাড়ের ওপরের বৃষ্টির পানি মাটি, গাছের শিকড় ও ভূগর্ভস্থ স্তরে সঞ্চিত হয়ে ধীরে ধীরে ছড়ায় ফিরে আসে। ফলে হাম হাম শুধু একটি জলপ্রপাত নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ পাহাড়ি জলাধার—বাস্তুতন্ত্রের দৃশ্যমান প্রকাশ।

একটি অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প

হাম হাম জলপ্রপাতের নাম শুনেছিলাম বহু বছর আগে। প্রয়াত তানিয়া খান ও তাঁর স্বামী প্রয়াত মুনির খান এবং তখনকার কিশোর পাখি পর্যবেক্ষক ও মাঠ সহকারী রফিককে সঙ্গে নিয়ে ২০১২ সালের দিকে এখানে এসেছিলেন। প্রাণিবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না নিয়েও তানিয়া একজন বন্য প্রাণিবিদ হয়ে উঠেছিলেন, নিজের মাঠের কাজের মাধ্যমে। আর মুনির খান ছিলেন বন বিভাগের কর্মকর্তা। তাঁরা দেশের জন্য সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙ বা গ্রিন কাসকেড ফ্রগ (Odorrana livida)–এর প্রথম সন্ধান পান। তাঁদের পর্যবেক্ষণটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। পরে ২০২১ সালে হাসান, রহমান, সাহা, সিদ্দিক ও দত্ত হারপেটোলজি নোটস জার্নালে বাংলাদেশে প্রজাতিটির প্রথম বৈজ্ঞানিক নথি প্রকাশ করেন।

তানিয়া-মুনিরদের মুখে সেই অভিযানের গল্প শুনে আমারও হাম হাম জলপ্রপাত যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা হয়েছিল, বিশেষ করে সেই ব্যাঙটির সন্ধানে। কিন্তু নানা কারণে সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ২০১৯ সালে তানিয়া ও মুনির দুজনেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলে আমার সেই ইচ্ছাও যেন হারিয়ে যায়।

কখনো কখনো জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছা বহু বছর পর আবার ফিরে আসে। এবারও তা–ই হলো।

আবার হাম হামের পথে

এ বছর বাংলাদেশের প্রাণিকুলের রেডলিস্ট হালনাগাদকরণ প্রকল্প ২০২৬-২৭-এর দলনেতা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলাম। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন, বাংলাদেশ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলে মাঠ জরিপের পরিকল্পনা করা হয়। সেই কর্মসূচিতে মৌলভীবাজার ও সিলেটের মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চল এবং হাম হাম জলপ্রপাত ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

হাম হাম জলপ্রপাতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে বাঁশের লাঠি হাতে লাল তালিকা এবং বন বিভাগীয় গবেষক দল
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

প্রথম মাঠ জরিপে রেডলিস্ট দলের ১৪ জন, বন অধিদপ্তরের ৭ জন, ২ মাঠ সহকারী, ২ স্থানীয় গাইডসহ আমরা হাম হাম অভিমুখে যাত্রা করি। লক্ষ্য ছিল প্রজাপতি, উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ এবং সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙ সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ। তবে সবাই যে একসঙ্গে হেঁটেছি, তা নয়। সবাই এসব তথ্য সংগ্রহের কাজে বিভিন্ন স্থানে পুরো সময়টি ব্যস্ত ছিলেন। আমরা ছিলাম ১১ থেকে ১৮ আগস্ট।

পাহাড়ের সঙ্গে যুদ্ধ

হাম হাম জলপ্রপাতে যাওয়ার পথ বেশ কঠিন
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

১৪ আগস্ট মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা-বাগান এলাকা থেকে জলপ্রপাতের দিকে এগোতে গিয়ে প্রায় ২০০ মিটার উচ্চতার পাহাড়ি অঞ্চলে উঠতে হয়। পাঁচ-ছয়টি ছোট পাহাড় অতিক্রম করতে হয় কিন্তু বর্ষায় পলিমাটিময় ঢালু অংশ অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। পর্যটক, গাইড ও বনজ সম্পদ সংগ্রহকারীদের চলাচলে তৈরি সরু পথই অনেক জায়গায় একমাত্র ভরসা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পাহাড়ে ওঠানামার পথে রেলিং–সদৃশ কিছু না থাকা। তাই পথের শুরুতেই স্থানীয় ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে ১০ টাকায় বাঁশের লাঠি কিনে নিই। সেই লাঠি সেদিন আমার ‘তৃতীয় পা’ হয়ে উঠেছিল। পরে সেটিই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ঢাকায় নিয়ে এসেছি।

হাম হাম জলপ্রপাতে পৌঁছানোর পাথুরে ছড়া দিয়ে যাচ্ছেন লেখক
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমার জন্য অভিযানটি আরও কঠিন ছিল। ৭৮ কেজি শরীরের সঙ্গে প্রায় ৫ কেজি ক্যামেরা ও ৫০০ মিমি টেলিলেন্স বহন করছিলাম। মাঠ সহকারী রফিক, যে বহু বছর আগে তানিয়া-মুনিরের সঙ্গেও এখানে এসেছিল, সে আমাকে পথ দেখাচ্ছিল। কয়েকবার পিছলে পড়লেও সে আমাকে ধরে ফেলে।

শেষের ৫০-৬০ মিটারের ভেজা ও খাড়া ঢালটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। একসময় পা পিছলে ছড়ার পাথুরে তলদেশের দিকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করি, যদিও তখনো রফিকের কাছে আমার একটা হাত ধরা ছিল। ঠিক তখন দলের মাঠ ব্যবস্থাপক সুলতান আমাকে ধরে ফেলে। পরে রফিক ও সুলতানের সহায়তায় ধীরে ধীরে নিচে নামি। পরে শেষের প্রায় ৫০০-৬০০ মিটার পাথুরে ছড়া পেরিয়ে পৌঁছাই জলপ্রপাতের কাছে।

যেখানে জলধারা গর্জন করে

পাহাড় থেকে প্রবল বেগে পানি পড়ছে, চারপাশে তার গর্জন
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

প্রায় ৪০-৫০ মিনিট ছড়া ধরে হাঁটার পর জলপ্রপাতের পাদদেশে পৌঁছে দৃশ্য দেখে সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। পাহাড় থেকে প্রবল বেগে পানি পড়ছে, চারপাশে তার গর্জন, বাতাসে ঠান্ডা পানির কুয়াশা, মনে হচ্ছিল শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে এসে পড়েছি।

তবে প্রকৃতির এই নির্জন সৌন্দর্যের মধ্যেই ছিল বিপুল মানুষের সমাগম। ৫০ জনের বেশি পর্যটক তখন সেখানে; কেউ গোসল করছেন, কেউ গান গাইছেন, কেউ নাচছেন, কেউ জলকেলিতে মেতে আছেন। নতুন দল আসছে, পুরোনো দল ফিরছে। তাঁদের মধ্যে একজন নারীসহ চার-পাঁচজন রাশিয়ার পর্যটককেও দেখলাম ছড়া ধরে জলপ্রপাতের দিকে যাচ্ছেন।

হাম হাম জলপ্রপাত তখন শুধু জলপ্রপাত নয়, এটি মানুষের আনন্দের এক বিশাল মঞ্চ। আর সেই দৃশ্য দেখে একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল, এই বিপুল মানুষের চাপ প্রকৃতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে?

একটি বাঁশের লাঠি, একটি ড্রাগনফ্লাই

বাঁশের লাঠিতে হঠাৎ এসে বসেছিল একটি ড্রাগনফ্লাই
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমার বাঁশের লাঠিতে হঠাৎ এসে বসেছিল একটি ড্রাগনফ্লাই। নতুন মনে হওয়া পোকাটির কয়েকটি ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। এ ধরনের ছোট ছোট মুহূর্তই মাঠ জরিপকে শুধু গবেষণা নয়, আনন্দের অভিযানেও পরিণত করে।

জলপ্রপাতের কাছে স্থানীয় দোকানও রয়েছে। কুরমা চা-বাগান গ্রামের দোকানিরা মাথায় করে খাবার ও পানীয় নিয়ে পাহাড় বেয়ে এখানে আসেন। যা বিক্রি হয় না, সেটিও আবার মাথায় করেই ফিরিয়ে নিতে হয়। হাম হামের পর্যটন অর্থনীতির পেছনে তাই স্থানীয় মানুষের প্রতিদিনের শ্রমও জড়িয়ে আছে।

শেষ পর্যন্ত মিলল সেই ব্যাঙ

হাম হাম জলপ্রপাতে পাওয়া বিরল প্রজাতির সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙ হাতে রেজা খান
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙের সন্ধান পাওয়া। কিন্তু দিনের বেলা অনেক মানুষের আনাগোনা, পানিতে পর্যটকদের সাঁতার ও প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে কোনো পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙের দেখা মিলছিল না। হঠাৎ বন বিভাগের সহকর্মী শিবলি একটি ব্যাঙাচি দেখতে পেলেন। প্রাথমিক পরীক্ষা করে বোঝা গেল—এটি সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙেরই ব্যাঙাণু। ব্যাঙবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাসান সেটা নিশ্চিত করলেন।

একমুহূর্তে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, পিচ্ছিল পাহাড় ও পড়ে যাওয়ার ভয়—সবকিছু সার্থক মনে হলো। তানিয়া ও মুনিরের বহু বছরের পুরোনো অনুসন্ধানের স্মৃতি যেন আবার হাম হামের অরণ্য থেকে ফিরে এল।

জলপ্রপাতের আসল সম্পদ

জরিপে শুধু ব্যাঙ নয়, আরও নানা বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের দেখা মিলেছে। প্রজাপতির বৈচিত্র্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ছড়ার পাথর ও তীরের নিচু অংশে ব্রায়োফাইট, লাইকেন ও মসের আবরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দেখা গেছে ড্যামসেলফ্লাই, ঘাসফড়িং, বাঘ-ছাপ গুবরে পোকা বা টাইগার বিটল, অন্য গুবরে পোকা, বোলতা, মাকড়সা, মিলিপিড ও পানিমাড়ি পোকা।

সরীসৃপের মধ্যে আঁচিল বা স্কিংক ও লিজার্ড এবং উভচরের মধ্যে কটকটি ব্যাঙের দুই প্রজাতিসহ কয়েকটি প্রজাতি পাওয়া গেছে। পাখির তালিকাও ছিল সমৃদ্ধ—বুলবুল, টুনটুনি, পাতা ফুটকি, কাঠঠোকরা, ধনেশ, ফিঙে, ঘুঘু, সুইচোরা, ফুলঝুরি প্রভৃতি। সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ছিল পাহাড়ি নীল-ঘাড় সুমচা বা ব্লু-নেইপড পিটারের বাসা যাতে ছিল ৫টি ডিম। অবশ্য কুরমা থেকে নেওয়া গাইডই বাসাটা আমাদের দেখায়। অন্তত দুই প্রজাতির কাঠবিড়ালিও চোখে পড়েছে। মরা গাছ ও বাঁশে ছিল বাহারি ছত্রাক। ছোট পাহাড়ি পাম ও মুসেন্ডার ফুলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল প্রজাপতি, মৌমাছি ও বোলতা।

এসব দেখেই আবার মনে হয়েছে জলপ্রপাতের চারপাশের পুরো পাহাড়ি বনই এর প্রকৃত সম্পদ।

বাঘছাপ-গোবরেপোকা বা টাইগার বিট, বিরল প্রজাপতি এবং ডানাহীন ফি (ওপরের সারিতে, বাঁ থেকে), বিরল ড্যামসেলফ্লাই, কটকটি ব্যাঙের দুটি প্রজাতি (নিচের সারিতে বাঁ থেকে)
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ফেরার পালা

ফেরার সময় বুঝলাম, নিচে নামার চেয়ে ওপরে ওঠা আরও কঠিন। শত শত পর্যটকের চলাচল ও ভেজা পোশাকের পানি মাটিকে আরও পিচ্ছিল করে তুলেছিল। প্রথম ৫০-৬০ মিটার উঠতেই আবার বিপদে পড়ি।

বন বিভাগের বন সংরক্ষক ছানাউল্লা পাটওয়ারী তখন এগিয়ে এসে কয়েকজন তরুণ পর্যটককে আমাকে সাহায্য করতে বলেন। অচেনা সেই তরুণেরা সত্যিই পাশে দাঁড়ালেন। রফিক হাত ধরে রইল, অন্যরা আমাকে সামলে দিল। অরণ্যের পথে মানুষ কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।

প্রথম কঠিন অংশ পার হওয়ার পর বাকি পাঁচ-ছয়টি পাহাড় তুলনামূলক সহজ মনে হলেও প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকতে হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা নিরাপদে চা-বাগান এলাকায় ফিরে আসি। যাওয়া–আসা মিলিয়ে অন্তত চার ঘণ্টা লাগল।

হাম হাম জলপ্রপাতের পাদদেশে লেখক ও লাল তালিকার কয়েকজন বিজ্ঞানী
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

হাম হাম জলপ্রপাত সবার জন্য নয়

হাম হাম জলপ্রপাত তরুণ ও শারীরিকভাবে সক্ষম মানুষের জন্য বেশি উপযোগী। বয়স্ক বা শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের এই দুর্গম পথে না যাওয়াই ভালো। ওখানে কেউ গেলে অবশ্যই অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা উচিত।

ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা বা স্যান্ডেল, হালকা পোশাক, পানির বোতল, মশা ও জোঁক প্রতিরোধক এবং বাঁশের লাঠি সঙ্গে রাখা দরকার। বর্ষায় বৃষ্টির পোশাকও উপকারী। পথে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক কার্যত থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ওষুধ জলরোধী প্যাকেটে রাখা এবং সঙ্গে প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রকৃতির কাছে গেলে দায়িত্বও নিতে হয়

হাম হাম জলপ্রপাতে পর্যটন বাড়ছে। এতে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু হাম হাম জলপ্রপাত কোনো বিনোদন পার্ক নয়; এটি একটি জীবন্ত পাহাড়ি বনের বাস্তুতন্ত্র।

তাই জলপ্রপাতের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। বিপজ্জনক অংশে সীমিতভাবে পরিবেশবান্ধব দড়ি বা বাঁশের হ্যান্ডরেইল স্থাপন, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের নিবন্ধিত ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। সংবেদনশীল ছড়া ও সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙের আবাসস্থলে পর্যটকের সংখ্যা এবং চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

একই সঙ্গে বনজ সম্পদ আহরণ, অবৈধ কাঠ সংগ্রহ এবং বাঁশ-বেতের অতিরিক্ত আহরণ বন্ধ করা জরুরি। কারণ, পাহাড়ের গাছ ও শিকড় কেটে ফেলা মানে শুধু বন ধ্বংস নয়, জলপ্রবাহের ভবিষ্যৎকেও দুর্বল করা।

পর্যটকদের জন্য প্রবেশপথেই সহজ নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে: কিছু ফেলবেন না, কিছু ভাঙবেন না, কোনো প্রাণী ধরবেন না, উচ্চ শব্দ করবেন না এবং প্রকৃতির কোনো কিছু সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন না।

শুধু জলপ্রপাত নয়, পাহাড়টিকেও বাঁচাতে হবে

হাম হাম জলপ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমার কাছে এখানেই। আমরা জলপ্রপাতকে ভালোবাসি, কিন্তু জলপ্রপাত নিজে নিজে বেঁচে থাকে না। তার জীবন আসে পাহাড়, বন, মাটি, শিকড়, বৃষ্টির পানি এবং অগণিত ক্ষুদ্র প্রাণ থেকে।

তানিয়া ও মুনির আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁদের দেখা সেই সবুজ জলপ্রপাত ব্যাঙের বংশধর হয়তো এখনো হাম হামের অরণ্যে বেঁচে আছে। আমরা সৌভাগ্যবান যে অভিযানে তার একটি ব্যাঙাচি দেখতে পেয়েছি।

প্রশ্ন হলো আমরা কি এমন একটি হাম হাম জলপ্রপপাত ও এর পাহাড়ি মেঠোপথ রেখে যেতে পারব, যেখানে আগামী প্রজন্মও সেই ব্যাঙের ডাক শুনবে, শেওলাঢাকা পাথর দেখবে, পাহাড়ি ছড়ার পানি ছোঁবে এবং দূর থেকে জলপ্রপাতের গর্জন শুনে একই বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে যাবে? যদি পারি, তবেই আজকের এই ভ্রমণ সার্থক হবে।

হাম হাম জলপ্রপাতকে তাই শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, জলপ্রপাতের সৌন্দর্য হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু একটি সুস্থ অরণ্যের জীবন বহমান।