বুনো ভেষজ উদ্ভিদ আগমুখী

ময়মনসিংহের কাছারিঘাটের ব্রহ্মপুত্রতীরে আগমুখী লতায় ফলছবি: লেখক

চলতি বছরের ১২ জুনের এক সকাল। জ্যৈষ্ঠ মাস, খুব গরম পড়েছে। প্রতিদিনের মতো ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রতীরের কাছারিঘাটে হাঁটছিলাম। কাছারিঘাটের বাঁ পাশে ‘হিমু আড্ডা’র উত্তর দিকে সিসি ব্লকে বাঁধানো তীরের এক কোণে কাশফুলের ঝোপ। সেখানে চোখ পড়তেই দেখতে পেলাম কুমড়ো লতার মতো জড়ানো একধরনের উদ্ভিদ, যাতে ধরে আছে ছোট ছোট সবুজ ও সিঁদুরে লাল রঙের ফল। এটিই আগমুখী—আমাদের প্রকৃতির এক অবহেলিত লতানো ভেষজ উদ্ভিদ।

আগমুখীর বৈজ্ঞানিক নাম Cucumis maderaspatanus, এটি Cucurbitaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি এশিয়া ও আফ্রিকার ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে লতাগুল্মের ঝোপঝাড়, খেতের আল কিংবা বাড়ির আশপাশের পুরোনো বেড়ায় প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায় এই উদ্ভিদ।

আগমুখী লতার কাণ্ড খুবই সরু, কোমল ও নমনীয়। কাণ্ডের গা রুক্ষ এবং খসখসে ছোট ছোট কাঁটার মতো সূক্ষ্ম রোমে ঢাকা থাকে। উদ্ভিদের প্রতিটি পর্ব থেকে একক ও সুতার মতো আকর্ষী বের হয়, যার সাহায্যে এটি নিকটবর্তী কোনো গাছ বা বেড়াকে জড়িয়ে ধরে ওপরে ওঠে।

পাতার আকৃতি কিছুটা তিরের ফলার মতো। পাতা ১ দশমিক ৫ থেকে ৯ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়। এটি সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি লোব বা খণ্ডে বিভক্ত থাকে। পাতার উপরিভাগ ও নিচের ভাগ বেশ খসখসে। পাতার পাড় সামান্য দাঁতের মতো খাঁজকাটা বা তরঙ্গায়িত।

ফুলগুলো আকারে অত্যন্ত ছোট এবং উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয়। পাতার কক্ষে এককভাবে বা ক্ষুদ্র থোকায় কাণ্ড ঘেঁষে তিন-চারটি ফুল ফোটে। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এতে প্রচুর ফুল ফুটতে দেখা যায়।

এর ফল ছোট, মসৃণ ও প্রায় গোলাকার মার্বেলের মতো (ব্যাসার্ধ শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ সেন্টিমিটার)। কাঁচা অবস্থায় ফলগুলো সবুজ এবং গাঢ় দাগযুক্ত থাকে, তবে পাকার পর এগুলো গাঢ় লাল বা সিঁদুরে লাল রূপ ধারণ করে। লাল ফলের ভেতরে চ্যাপটা, ওভেট আকৃতির মসৃণ বীজ থাকে।

লোকচিকিৎসা এবং আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানে আগমুখী লতার বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে।

লতাটির পাতা, বীজ ও কাণ্ডে বেশ কিছু সক্রিয় জৈব উপাদান পাওয়া যায়। এতে প্রাপ্ত ফ্লেভোনয়েডস ও ফেনোলিক যৌগ শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। স্টেরয়েডস ও স্যাপোনিন প্রদাহ দূর করতে সাহায্য করে। এর বীজে হেক্সাডেকানোয়িক অ্যাসিড ও অক্টাডেকানোয়িক অ্যাসিডের উপস্থিতি রয়েছে।

আধুনিক কিছু গবেষণায় এর নির্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক ইতিবাচক কার্যকারিতা দেখিয়েছে। লিভারের টক্সিন দূর করতে এবং কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর পাতার নির্যাসে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসবিরোধী উপাদান থাকে।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় আগমুখী পাতার রস বেশ কার্যকর। সর্দি, ক্রনিক কাশি, হাঁপানি এবং কফজনিত বুকব্যথায় এর পাতা সেদ্ধ করে ক্বাথ পান করা হয়। এর বীজ পেট ফাঁপা, গ্যাস ও অজীর্ণ দূর করতে ভূমিকা রাখে। এটি ক্ষুধা বাড়াতে এবং পরিপাকতন্ত্র সচল রাখতে সাহায্য করে।

এর পাতায় প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী গুণ রয়েছে। শরীরে বা গেঁটে বাতে ফোলা ও ব্যথা হলে পাতা বেটে প্রলেপ দেওয়া হয়। দাঁতের ব্যথায় বীজ চিবানোর প্রথা রয়েছে। দেহ ঠান্ডা রাখতে ও অতিরিক্ত পিত্তভাব কমাতে এটি উপকারী। দুশ্চিন্তা বা মাথাঘোরার সমস্যা কমাতে পাতা বেটে মাথায় ব্যবহারের রেওয়াজ আছে।

দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে আগমুখীর কচি পাতা ও ডাল ভেজে, স্যুপ হিসেবে বা চাটনি ও দোসায় মিশিয়ে সুস্বাদু ভেষজ খাবার হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

এটি প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমে পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে এবং ঝোপঝাড়ের মাটির ক্ষয়রোধে কাজ করে।

প্রকৃতির এই সাধারণ লতাটি প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসার এক অনন্য উদাহরণ। গ্রামীণ জীবনের ভেষজ চিকিৎসায় এবং বর্তমানের বায়ো-ফার্মাকোলজি গবেষণায় এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এক উদ্ভিদ।

চয়ন বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ