কোষানৌকা সরু খালের ভেতর দিয়ে ঢোলকলমির ঝোপের দিকে এগিয়ে চলল। ঝোপে কিছু একটাকে নড়তে দেখলাম। পানি কম থাকায় ও নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদের কারণে লগি মেরে সামনে এগোতে কষ্ট হচ্ছে।

কিছুটা এগোনোর পর নৌকা থামাতে বললাম। ঢোলকলমির কাণ্ডের ফাঁক দিয়ে একটি শিকারি পাখিকে ভূমিতে বসে থাকতে দেখলাম। পাখিটি তো আগে কখনো দেখিনি। ধীরে ধীরে ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করছি। হঠাৎ অতি সতর্ক পাখিটি টের পেয়ে উড়াল দিল। আমরাও পেয়ে গেলাম ওর কিছু উড়ন্ত-দুরন্ত ছবি।

পাখিটির ডানা ও লেজ চওড়া; দেহ আঁটসাঁট। দেহের নিচটা মোটামুটি সাদা, কোমর সাদা ও লেজ কালো। ডানার নিচে ফ্যাকাশে ছোপ থাকে। দেহের দৈর্ঘ্য ৪৭-৫৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১১৯-১৪৫ সেন্টিমিটার ও ওজন ৩৭০-৭৮০ গ্রাম।

ওরা জলাভূমি, স্যাঁতসেঁতে ঘেসো মাঠ, আর্দ্র ধানখেত, নলবন ও হাওরাঞ্চলে একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। জলাভূমির সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে খাবার খোঁজে। ইঁদুর, ব্যাঙ, সরীসৃপ, ছোট মাছ, বড় কীটপতঙ্গ ও দুর্বল পাখি পেলে পায়ের ধারালো নখে গেঁথে ফেলতে দেরি করে না। প্রজননকাল ছাড়া অন্য সময় সচরাচর নীরব। পুরুষ পাখি মাঝেমধ্যে ‘পিশিই-পিশিই...’ ও স্ত্রী পাখি কদাচ ‘কিউ-কিউ...’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ওদের আবাস এলাকার নলখাগড়ার ওপর কাঠিকুটি দিয়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ৭টি, রং সাদা, যা ৩৩-৪৮ দিনে ফোটে। ছানারা ৩৫-৪০ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল প্রায় আট বছর।

মুহুরি সেচ প্রকল্পের জলাভূমিতে দেখা শিকারি পাখিটি এ দেশের এক দুর্লভ পরিযায়ী চিল। ওর কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম ইস্টার্ন মার্শ-হেরিয়ার।

অনুবাদ করে পূর্বাঞ্চলীয় জলার চিল বলা যায়। অ্যাক্সিপেডিট্রি গোত্রের চিলটির বৈজ্ঞানিক নাম Circus spilonotus। উত্তর-পূর্ব চীন, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব সাইবেরিয়া ও উত্তর জাপানের আবাসিক পাখিটি শীতে দক্ষিণ চীন, তাইওয়ান, কোরিয়া, দক্ষিণ জাপান, উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে পরিযায়ী হয়।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন