জলবায়ুর অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিকে নীতিকাঠামোয় আনতে হবে

গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) নুজহাত জাবীন, গওহার নঈম ওয়ারা, জিয়াউল হক, রাবেয়া বেগম ও কবিতা বোস। গতকাল ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

জলবায়ুর বৈশ্বিক আলোচনায় দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও এটির প্রভাবে নদীভাঙন, বাল্যবিবাহ, বাস্তুচ্যুতিসহ মানসিক, সামাজিক ও পরিচয়গত যে অদৃশ্য অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি, সেটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। এসব ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে জলবায়ুজনিত প্রভাবের অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিকে আমাদের জাতীয় নীতিকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি (এনইএলডি) পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন আলোচকেরা।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস) ও প্রথম আলো এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। আয়োজনে সহযোগিতা করেছে ক্লাইমেট জাস্টিস রেজিলিয়েন্স ফান্ড (সিজেআরএফ)।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমাদের নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ (অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি) নিয়ে ২০১৩ সালের পর থেকে বিভিন্ন রিপোর্ট হয়েছে এবং ২০২৪-এর সর্বশেষ রিপোর্টে আমরা নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজের এরিয়াগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি।’

এগুলোকে আমাদের জাতীয় দলিলে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে জানিয়ে মো. জিয়াউল হক বলেন, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার মানদণ্ডগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করা দরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি এবং ন্যাশনাল প্ল্যান অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ নামে খুব সুন্দর একটি ডকুমেন্ট তৈরি করেছে।

জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা এখন একটি ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ফর লস অ্যান্ড ড্যামেজ প্রস্তুত করছি, যা শেষ পর্যায়ে আছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) কার্বন নিঃসরণে জাতীয় অঙ্গীকারে (এনডিসি) অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও এ বিষয়টিকে মূলধারায় নিয়ে আসা ও জাতীয় নীতিকাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম কল্পনা উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘সবার কাছ থেকে অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে শুনতে এ গোলটেবিলের আয়োজন। শরীয়তপুর জেলায় আমরা কাজ করি। এখানে যে নদীভাঙন হয়, সেটা জাতীয় ও বৈশ্বিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।’

রাবেয়া বেগম বলেন, এ দুর্যোগকে জাতীয়ভাবে মূলধারার দুর্যোগ হিসেবে দেখা না হলে একটি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা করা হবে। নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর বাস্তুচ্যুতি, পেশা হারানো—এগুলো অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি। এসব নিয়ে আমাদের আরও বেশি কথা বলা দরকার।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম কল্পনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক আব্দুর রাজ্জাক।

প্রবন্ধে এসডিএসের করা গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়, শরীয়তপুর জেলায় গবেষণা এলাকার ৯৮ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ জেলায় একদিকে বন্যা ও অন্যদিকে নদীভাঙন—এ দুই দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে বলে প্রবন্ধে বলা হয়েছে।

বাস্তুচ্যুতির কারণে পরিচয় সংকট, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে ছিটকে পড়া ও বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা বাড়ছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

অনুষ্ঠানে নদীভাঙনের শিকার হয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিলে সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে থাকতে হয় বলে জানিয়েছেন নদীভাঙনের শিকার হওয়া শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার আবদুল বারেক (৫০), জাজিরা উপজেলার বিলকিস আক্তার (৪০) ও যুব প্রতিনিধি হুমায়রা আক্তার (১৭)।

নদীভাঙনের শিকার কৃষক শরীয়তপুরের আবদুল বারেক বলেন, ‘আমি এ পর্যন্ত আটবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি। অন্য এলাকায় আশ্রয় নিলে “রোহিঙ্গা” বলে কটাক্ষ করা হয়। অন্যের জমি নিয়ে চাষ করতাম। সে জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে।’ জাজিরার বিলকিস আক্তার টেকসই বেড়িবাঁধ এবং যুব প্রতিনিধি হুমায়রা আক্তার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি চালু করার দাবি জানান।

পদ্মার শরীয়তপুর অংশে লবণাক্ততা বাড়ছে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও এসডিএস চেয়ার গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘পদ্মার শরীয়তপুর অংশে লবণাক্ততা বাড়ছে। কেন বাড়ছে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি? পদ্মার মূল ধারা থেকে বেশ কয়েকটি জেলায় নানা প্রকল্পে পানি তুলে নিচ্ছে, যার ফলে লবণাক্ততা শরীয়তপুর পর্যন্ত চলে আসছে।’

নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘নদী ভাঙলে সমাজ ভাঙে। সমাজকে অক্ষত রাখার কোনো কর্মসূচি আমাদের নেই। দুর্যোগের অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির সবচেয়ে বেশি শিকার হয় শিশুরা। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ইটভাটায় চরের শিশুরা কাজ করে। মে মাসে তারা ফিরে এলে স্কুলে আর তাদের নেওয়া হয় না।’

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, ‘সাতক্ষীরা কর্ম এলাকার মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ের তথ্য সাতক্ষীরা থেকে রিসোর্স এলোকেশন (তহবিলের উৎস) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’

কবিতা বোস বলেন, শুধু কাঠামোগত জায়গায় কাজ করলে হবে না। সমন্বিত চেষ্টা ছাড়া এ সংকটের সমাধান হবে না।

ক্রিশ্চিয়ান এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুজহাত জাবীন অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে উপাত্তের ঘাটতি আছে উল্লেখ করে বলেন, এখানে তথ্যভিত্তিক কাজের সুযোগ আছে। দৃশ্যমানতা না থাকলে কোনো কিছু সংখ্যায় নিরূপণ করা কঠিন। অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিকে রেজিলিয়েন্স কর্মসূচিতে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি।

সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘দৃশ্যমানতা না থাকলে আমরা ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বুঝতে পারি না। আমাদের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির নির্ধারণ পুরোটাই দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভরশীল। এটাতে পরিবর্তন আনতে হবে।’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের হিউম্যানিটারিয়ান ও রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শামসুজ্জামান, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকো–অপারেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট-২ ফারহানা আফরোজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কেয়ারের ডেপুটি চিফ অব পার্টি মৃত্যুঞ্জয় দাস, এসডিএসের প্রতিষ্ঠাতা মজিবুর রহমান, আইসিসিসিএডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিব হক, স্টার্ট নেটওয়ার্ক‍ের হেড অব নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট সাজিদ রাইহান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্সের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুল হাসান শাওন।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।