সোনালতার সোনাফুল
আকাশজুড়ে মেঘ জমেছে, শ্রাবণধারায় প্লাবিত হচ্ছে বসুন্ধরা। ঝরঝর ঝরছে বৃষ্টি গাছের ওপর, পাতার ওপর, ফুলের ওপর। বৃষ্টিটা একটু ধরে আসতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাছপালার নেশায় ছুটে গেলাম খুলনা শহরের এক নার্সারিতে। বয়রায় এক নার্সারির বেড়ায় লতিয়ে উঠেছে ঝোপালো ঘন পাতার এক লতানো ঝোপ। তেলতেলা কোমল সবুজ পাতার ওপর থেমে যাওয়া বৃষ্টির জলকণা, দিনের আলোয় চকচক করছে। তবে সে ঝোপটাকে আলো করে ফেলেছে সে গাছে ফোটা থোকা থোকা সোনারঙা ছোট ছোট ফুল। নার্সারির ভেতরেও দেখলাম একটি বয়স্ক গাছ। সে গাছের শোভা অতটা ঝোপালো ও বাহারি না হলেও বৃষ্টিভেজা সোনারং ফুলগুলোকে বড্ড স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। ফুলের চেয়ে পবিত্র কিছু কি পৃথিবীতে আছে? আমার জানা নেই।
গত বছর শ্রাবণে সে গাছ দুটির আসলে সঠিক নাম জানা ছিল না। গাছটাকে নতুন বলে মনে হলো। নার্সারির মালিদের কাছে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা সে গাছের নাম বলেছিলেন সোনাঝরা। নামটা নিয়ে খটকা লেগেছিল। তবে ফুল দেখে পছন্দ হওয়ায় তার একটি চারা কিনে নিয়ে এসে বাড়ির ছাদবাগানে লাগাই। এ বছর শ্রাবণের ৪ তারিখে বাড়িতে গিয়ে দেখি ছাদের রেলিং বেয়ে গাছটা বেশ ঝাঁপিয়ে গেছে। তাকে সঙ্গ দিচ্ছে অপরাজিতার লতারা। দুইয়ে মিলেমিশে বড় হচ্ছে, ফুলও ফুটছে—একটার রং হলুদ, অন্যটা নীল। গত বছর আর গাছটাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। বাড়ি থেকে ফিরে এসে গেলাম আগারগাঁওয়ের জাতীয় বৃক্ষমেলায়। বেশ কয়েকটা নার্সারির বাগানে দেখলাম আবার তাকে, ফুলসহ গাছ। এবার তার সঠিক নামটা তাদের কাছ থেকে জানা গেল, ডিসি নার্সারির দীপক দাদা বললেন, ওটার আসল নাম অস্ট্রেলিয়ান গোল্ড ভাইন। সোনার মতো হলদে ফুল ফোটে, তাই আমরা বলি সোনালতা।
বাসায় ফিরে তথ্য খুঁজতে গিয়ে এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম পেলাম Tristellateia australasiae, গোত্র মালপিজিয়েসি, ইংরেজি নাম অনেক—Australian Gold Vine, Shower of gold climber, Vining Galphimia, Vining Milkweed ইত্যাদি। তবে অস্ট্রেলিয়ান গোল্ড ভাইন নামেই গাছটি বেশি পরিচিত। সে জন্যই মনে হয় বাংলায় বলা হয় অস্ট্রেলিয়ান সোনালতা। নার্সারির কেউ কেউ সোনাঝরা বলেন। তবে সোনাইলগাছের আরেক নাম সোনাঝুরি এবং গোল্ডেন শাওয়ার ফুলের বাংলা নাম সোনাঝুরি লতা। তাই বিভ্রান্তি এড়াতে এ গাছের সোনাঝরা নামটি পরিহার করে সোনালতা বলা ভালো। আবার স্বর্ণলতা নামও বলা যাবে না, কেননা সে নামে একটা পরিচিত পরাশ্রয়ী গাছ এ দেশে আছে। তবে সোনালতার জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে নিউ ক্যালেডোনিয়া পর্যন্ত এ গাছের আদি বাসভূমি। সেখান থেকে এখন বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এ গাছ অনেকের বাগানে সুদর্শন লতা হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। গাছটির কিছু ঔষধি গুণের কথাও জানা গেছে। কোনো কোনো দেশের স্থানীয় বৈদ্যরা এ গাছের মাটির নিচে থাকা কন্দ বা রাইজোম থেকে একধরনের বিশেষ পানীয় তৈরি করেন, যা পান করলে রক্তের রক্তকণিকা ও শ্বেতরক্তকণিকা বাড়ে, এতে রক্ত ভালো থাকে।
এটি ছোট আকারের লতানো প্রকৃতির চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী গাছ। লতানো না বলে আরোহী লতা বলাই ভালো। কেননা গাছটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লতাগুলো কাষ্ঠল হয়ে যায়। আরোহী লতা ১০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কিছু দেশে এ গাছ প্রাকৃতিকভাবে উপকূলীয় বনাঞ্চলে, জলাভূমির আর্দ্র স্থানে, ঝিরির পাড়ে আগাছার মতো জন্মে। কিন্তু বাংলাদেশে এ গাছ এসেছে বাগানের ফুলগাছ হিসেবে। গাছে প্রায় সারা বছর ধরেই ফুল ফোটে, তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এ দেশে বেশি ফুটতে দেখা যায়। পাতার কোলে থাকা গিঁট থেকে লম্বা ছড়ার মতো পুষ্পমঞ্জরি সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ রঙের তারার মতো ফুল ফোটে, ফুলগুলোর পাপড়ি থাকে পাঁচটি, কেন্দ্রস্থলে থাকে লাল রঙের পুরুষ কেশর। ওই ক্ষুদ্র লাল কেশর কয়েকটি সোনারং ফুলগুলোকে দিয়েছে আলাদা এক সৌন্দর্য। ফুল গন্ধহীন। দ্রুতবর্ধনশীল গাছ। পাতা প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, বর্শার ফলার মতো, সূক্ষ্মাগ্র, সবুজ, মসৃণ, কিনারা মসৃণ। ফুল ফোটে ডালের আগায় থোকা ধরে। ছড়ার মতো একটি পুষ্পমঞ্জরিতে ৩০টি পর্যন্ত ফুল থাকে। ফল হয়, ফলগুলো ডানাযুক্ত তারার মতো ক্যাপসুল। ফল পাকার পর বাদামি রঙের ক্যাপসুলে পরিণত হয়। বীজ ও কাটিং থেকে চারা তৈরি করা যায়।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক