default-image

মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, এবার ইলিশ উৎপাদন ভালো হবে। এর পেছনে কিছু যুক্তি তুলে ধরছেন তাঁরা।

বর্ষার এ সময় ইলিশ মূলত দুটি কারণে সাগর ছেড়ে নদীর দিকে আসতে শুরু করে। একটি কারণ হলো খাবার সংগ্রহ, দ্বিতীয়টি প্রজনন। ইলিশের এই আগমনে নদীর পানির গুণাগুণ বড় নিয়ামক ভূমিকা রাখে। পানির মান ভালো হলে ইলিশের এই বিহার নির্বিঘ্ন হয়, জেলের জালেও আটকা পড়ে বেশি।

আর শেষ পর্যন্ত পাতেও এর ঠাঁই হয়। তিনটি কারণে এবার ইলিশের উৎপাদন ভালো হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো সর্বশেষ পানির অপেক্ষাকৃত উন্নত মান, মৎস্য প্রজনন–সফলতার হারের বৃদ্ধি, জাটকা নিধন রোধের অভিযানে সফলতা।

ইলিশের আগমনপথগুলোয় পানির মান কেমন, তা দেখভাল করেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুর। এ প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা গত মে মাসেই পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও-ডিসলভ অক্সিজেন), পিএইচ, হার্ডনেস (ক্ষারত্ব), অ্যামোনিয়ার পরিমাণ ইত্যাদি দেখেছেন।

পানির ভালো মান জাগাচ্ছে আশা

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পানির মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিল ও মে মাসে পরিমাপ করা হয়। ইলিশ বা অন্য মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রে যে চার বিষয়কে পরিমাপ করা হয়েছে, এর সব কটিতেই গত বছরের মতোই উন্নত মান পাওয়া গেছে।’

default-image

চাঁদপুর লঞ্চঘাট, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার মিলনস্থল যেখানে মেঘনায় মিলিত হয়েছে, সেই মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার শাটনল, চাঁদপুরের হরিণাঘাটের কাঁটাখালীসহ কয়েকটি এলাকা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মো. আনিছুর রহমান বলেন, করোনাকালে ২০২০ সালের পর থেকে এর আগের বছরের তুলনায় পানির মান অপেক্ষাকৃত উন্নত হয়। চলতি বছরে গত বছরের তুলনায় কিছুটা মানের অবনমন হলেও মাছের জন্য তা এখনো যথেষ্ট অনুকূলে।

পানির মান বিচারে অন্যতম নিয়ামক হলো পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বা ডিও। যদি ডিওর পরিমাণ প্রতি লিটারে পাঁচ মিলিগ্রামের কম হয়, তবে তা জলজ পরিবেশের জন্য কম উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। পানির মান পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ বছর দ্রবীভূত অক্সিজেনের গড়পড়তা পরিমাণ পাঁচ মিলিগ্রামের বেশি। তবে শাটনল এলাকায় এটি ছিল সাড়ে চার মিলিগ্রাম।

আনিছুর রহমান আরও বলেন, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর দূষণের কারণে শাটনলে পানির এই হাল। তবে মে মাসের পর নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। তাই ডিও আরও বাড়বে বলেই আশা করা যায়।

নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাসায়নিক যৌগ হলো অ্যামোনিয়া। যে পানির মান ভালো, সেখানে এর শূন্য উপস্থিতি থাকতে হবে। গত বছর এটি শূন্য ছিল। এ বছর অবশ্য শূন্য দশমিক ২ ভাগ।

default-image

অ্যাসিড ও ক্ষারের পরিমাপক হলো পিএইচ। জলজ প্রাণীর সহনীয় পরিবেশের ক্ষেত্রে পিএইচ থাকতে হবে সাড়ে সাত থেকে সাড়ে আটের মধ্যে। সাতের নিচে নয়। এবার পানিতে পিএইচ ছিল সাড়ে সাতের ওপরে।

পানিতে হার্ডনেসের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ৪০ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম থাকলে ভালো। এবার গড়ে ৭০-এর মধ্যে থেকেছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

প্রজনন–সফলতার হার বেড়েছে

পানির এই ভালো মানের সঙ্গে আরেকটি সুখবর হলো ইলিশের প্রজনন–সফলতার হার বৃদ্ধি। ইলিশের ডিম ছাড়ার হার হলো প্রজনন–সফলতা। মৌসুমের শেষে অক্টোবর মাসে এ হার দেখা হয়। গত বছরের প্রজনন–সফলতার হার ছিল শতকরা ৫১ দশমিক ৭৬। আগের বছর এ হার ছিল শতকরা ৫১ দশমিক ২।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নিয়ামুল নাসের প্রথম আলোকে বলেন, পানির মানের সঙ্গে প্রজনন–সফলতার একটি সম্পর্ক আছে নিঃসন্দেহে। এর হার বৃদ্ধি ভালো ইলিশ উৎপাদনের ইঙ্গিত দেয়।

পানির মান ভালো হওয়ার সঙ্গে যেমন প্রজনন–সফলতার সম্পর্ক আছে, এর পাশাপাশি মাছের জন্য খাদ্যের সংস্থানও এতে বাড়ে। আনিছুর রহমান মনে করেন, উন্নত পানির জন্য খাদ্যের পরিমাণ বেড়েছে। আবার সেই সঙ্গে প্রজনন–সফলতাও বেড়েছে।

উৎপাদন বাড়ছে প্রতিবছর

দেশে প্রতিবছর ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দুই লাখ মেট্রিক টনের বেশি। ২০১১-১২ সালে দেশে ইলিশের উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন। আর সর্বশেষ ২০২০-২১ বছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন। ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারের নেওয়া বিশেষ কর্মসূচিগুলো এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধরা হয়।

জাটকা ও প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণে বছরে বিভিন্ন সময় আহরণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। আর সে সময় জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করা হচ্ছে। এ সময়ে জেলেদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি দেশে ছয়টি অভয়াশ্রম করা হয়েছে। পদ্মা, মেঘনার ঊর্ধ্বাঞ্চল ও নিম্ন অববাহিকা, কালাবদর, আন্ধারমানিক, তেঁতুলিয়াসহ অন্যান্য উপকূলীয় নদীর মোহনায় মোট ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম করা হয়েছে। ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ শাখার প্রধান মাসুদ আরা মমির দাবি, এসব কর্মসূচি ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সহযোগিতা করছে। এই কর্মকর্তা এবারও ইলিশের ভালো উৎপাদন আশা করছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘গত বছরের প্রায় পুরো সময় আমরা ইলিশ পেয়েছি। আর এবার মাছ ধরা বন্ধের কর্মসূচিগুলো সফলতার সঙ্গে শেষ হয়েছে। এসবের নিশ্চয়ই একটা ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখনো পুরোপুরি মৌসুম শুরু হয়নি। কিন্তু তিন দিন ধরে জেলেদের কাছে থেকে ভালো সংবাদ পাচ্ছি আমরা।’

গবেষক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও এবার ভালো ফল পাবেন বলে আশা করছেন। পটুয়াখালী শহরের নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মো. মনির হাওলাদার ২৫ বছর ধরে ইলিশের ব্যবসায় করছেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে মাছ আসছে। তবে দাম কিছু বেশি। গত বছর ইলিশ দেরিতে এসেছিল। এবার মৌসুমের শুরুতেই মাছ আসতে শুরু করেছে।

পটুয়াখালীর গলাচিপা বাজারের ইলিশের দাম জানান মনির হাওলাদার। গতকাল এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। দেড় কেজি ওজনের দাম ১ হাজার ৭০০ টাকা। ৯০০ গ্রামের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। আর ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রামের দাম কেজিতে ৮০০ টাকা। মনির বলেন, ‘দু-তিন দিনের মধ্যে মাছের দাম কমবে।’

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন