অবৈধ চায়না দুয়ারি জালে হুমকিতে জলজ প্রাণী, বিক্রি হয় দোকানে, ফেসবুক–ইউটিউবে
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পেজ, আইডি ও চ্যানেল থেকে এই জাল বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দোকানেও এগুলো কিনতে পাওয়া যায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের একটি প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, দেশি প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারে মাছ, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচার ধ্বংস হচ্ছে।
চায়না দুয়ারি জাল মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ। এর দুই পাশে দুয়ার বা প্রবেশপথ রয়েছে। যেখান দিয়ে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী প্রবেশ করে, কিন্তু বের হতে পারে না। এটি চায়না রিং জাল নামেও পরিচিত। কয়েক হাত থেকে শত হাত লম্বা এই জালে একটু পরপর রিং বসানো থাকে।
মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে ‘চায়না দুয়ারি জাল’ শব্দবন্ধের উল্লেখ নেই। তবে আইনে বলা আছে, ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ স্থাপন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আইন অনুযায়ী ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ হলো মাছ ধরার জন্য মাটিতে গেঁথে বা অন্য কোনো উপায়ে স্থিরীকৃত কোনো জাল, খাঁচা, ফাঁদ বা অন্য কোনো কৌশল।
চায়না দুয়ারি জাল ফিক্সড ইঞ্জিনের আওতায় পড়ে এবং এটি অবৈধ বলে জানান মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে খাল–বিল, নদী–নালা, হাওর–বাঁওড়ে একসময় মাছ পাওয়া যাবে না। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী রক্ষায় এই জাল অবৈধ করা হয়েছে।
বিক্রি হয় দোকানে, ফেসবুক–ইউটিউবে
ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দিয়ে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি করা হয়ে থাকে। কিছু ভিডিও বিজ্ঞাপনে রিং লাগিয়ে মাছ ধরার উপযোগী চায়না দুয়ারি জাল দেখানো হয়। আবার কিছু ভিডিও বিজ্ঞাপনে জাল তৈরির কারখানা দেখানো হয়। তবে কারখানা কোথায়, তা ভিডিওতে উল্লেখ করা হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারখানার মালিক নিজের মুখ দেখান না। এসব ভিডিওতে ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমো নম্বর দেওয়া থাকে। কেউ এসব নম্বরে যোগাযোগ করলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তারা এই জাল সরবরাহ করে থাকে। টাকার লেনদেন বিকাশ কিংবা রকেটের মাধ্যমে হয়।
‘চাইনা রিং জাল পাকাড়ি বাজার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৪টি ছবি, ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। কারখানার ঠিকানা পেজে পাওয়া যায় না।
বিভিন্ন পোস্টে ২৫ হাত থেকে ১০২ হাত লম্বা চায়না দুয়ারি জালের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘চায়না রিং জাল’ নামেই অনেকগুলো পেজ রয়েছে। এ ছাড়া বিডি ফিশিং গিয়ার্স, চায়না রিং জাল কালেকশন, চায়না রিং জাল বিক্রয় বাজার, চায়না রিং জাল বাজার, চায়না রিং জাল অনলাইন শপ, চায়না রিং জাল পাইকারি বাজার, চায়না রিং জাল হাউজ, চায়না রিং জাল পাইকারি সেল বাজার নামেও পেজ আছে।
ইউটিউবেও এই জাল বিক্রি করা হচ্ছে। চায়না রিং জাল নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, কারখানায় চায়না দুয়ারি জাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ফোন নম্বর দেওয়া হচ্ছে। দামও উল্লেখ করা আছে।
ঢাকার বাজারেও এই জাল পাওয়া যায়। ৫ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার চকবাজারে একজন দোকানদার জানান, তাঁর কাছে চায়না দুয়ারি জাল আছে। তিনি কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা থেকে জাল এনে বিক্রি করেন বলে জানান।
অবৈধ এই জালের বিক্রি ও ব্যবহার ঠেকাতে মৎস্য অধিদপ্তর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদ কনক প্রথম আলোকে বলেন, চায়না জাল তৈরির উপকরণ (জাল ও রিং) সহজলভ্য। তা ছাড়া অধিদপ্তরের জনবলসংকট রয়েছে। তাঁদের একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় প্রতিদিন অভিযান চলছে।
মৎস্য অধিদপ্তর গত ১৩ এপ্রিল দেশের সব বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকদের চিঠি দিয়ে অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বাড়িয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এরপর কিংবা চলতি বছর অধিদপ্তর কত অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে, তার তথ্য নেই অধিদপ্তরে। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন অবশ্য দাবি করেন, তাঁরা ব্যাপকভাবে চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কয়েকটি কারখানার বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন।
২০২০–২১ সাল থেকে দেশে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শহীদ রেজা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাছ থেকে শুরু করে সাপ, ব্যাঙসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী আটকে পড়ে চায়না দুয়ারি জালে। এ কারণে সরকার বাধ্য হয়ে এই জাল নিষিদ্ধ করে। এটি কার্যকর করতে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে প্রচারও চালাতে হবে।