জার্মানির একটি শহরে প্রায়ই যাওয়া হয়। ড্রেসডেন শহর থেকে ট্রেনে চেপে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ। তবে দ্রুতগতির ট্রেনে সময় আরও কম লাগে। শহরটির যেখানে থাকি, জায়গাটা নিরিবিলি। রুমের জানালা দিয়ে মাঠে সবুজ ঘাস দেখি। দেখি, অল্প বাতাসে চেরিগাছের পাতা দুলছে।
দুই প্রজাতির ঘুঘুর ডাক—কমন রেডস্টার্ট ও ব্ল্যাক বার্ডের ছোটাছুটি দেখে সকাল ও বিকেলের সময় কাটে। এখানে যে বিষয়টি ভালো লাগে—একটু দূরে গাছপালায় ঘেরা অংশ থেকে সকালে মোরগের ডাক শোনা যায়। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে কেউ মুরগি পোষেন। মুরগিগুলো দুপুরের দিকে যখন ডাকে, তখন বরিশালের গ্রামের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। এ রকম ডাক দিলে বোঝা যাবে, মুরগির ডিম পাড়ার সময় হয়েছে। এমন ডাক দেওয়ার পর মুরগি ঘরে রাখা কুঁড়া বা তুষের ডোলায় গিয়ে ডিম পাড়তে বসতো, কখনো বসতো মাটির তৈরি হাজালে।
জার্মানিতে প্রায় ৪৭০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। প্রায় শত প্রজাতির পাখির সঙ্গে প্রকৃতিতে আমার দেখা হয়েছে। গাঢ় সবুজ রঙের ইউরোপীয় বি-ইটার দেখার বিষয়ে কয়েকজন পাখি বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা বলেন, এ পাখি সব জায়গায় দেখা যায় না। একজন বলেন, সাক্সনি আনহাল্ট স্টেটের গ্রামের দিকে দেখা যায়। অবশেষে পাখিগুলোর সঙ্গে দেখা হলো সেই গ্রামে।
এগুলো মাঠের কাছের কোনো বড় গাছ বা গুল্ম–আচ্ছাদিত জায়গায় বাস করে। দিন কয়েক আগে পাখি গবেষণার কাজে একটি গ্রামের বনের কাছে গিয়ে ডাক শুনলাম এসব পাখির। এরপর দেখা গেল আকাশে মনের আনন্দে পাখিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। একটু পরেই আবার উড়ে এসে বনের গাছের শাখায় বসছে। এ পাখির ইংরেজি নাম ইউরোপিয়ান বি-ইটার। বাংলায় এ পাখিকে ‘সুইচোরা’ বলা হয়। পুরো ইউরোপে দুই প্রজাতির বি-ইটার আছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় বি-ইটার দেখতে অসাধারণ। কয়েকটি রঙের পালকে সজ্জিত এ পাখির রূপ অতুলনীয়। বিশেষ করে উজ্জ্বল আলোয় বুকের সবুজ পালক সবার নজর কাড়ে।
গুল্ম ও বৃক্ষসমৃদ্ধ বনে প্রায় অর্ধশত বি–ইটার পাখি নজরে এলো। ওড়াউড়ি ও কলরবে পাখিগুলো ব্যস্ত। ডাক স্বতন্ত্র ও মৃদু। তরল সুরের প্রি...প্রি ..পুরুপ কলতান। গমখেতের দিকে উড়ে গিয়ে পোকা ধরার পরে গাছের ডালে বসে খায়। অনেক সময় একই শাখায় একাধিক পাখি বসে। শীতকালে এ পাখি উষ্ণমণ্ডলীয় আফ্রিকায় সময় কাটায়। প্রজনন মৌসুমে বালুকাময় নদীতীরে, মাঠের কাছে; সাধারণত মে মাসের শুরুতে বাসা বাঁধে। অপেক্ষাকৃত একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গ তৈরি করে।
পুরুষ ও স্ত্রী পাখি উভয়েই ডিমে তা দেয়। ছানাগুলোকে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পালন করে। প্রধানত পোকামাকড় খায়, বিশেষ করে মৌমাছি ও বোলতা। উড়তে উড়তে পোকামাকড় ধরে। একটি পাখি প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি মৌমাছি খেতে পারে।
স্পেনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ পাখির খাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিকার ইউরোপীয় ‘মধু মৌমাছি’। এ পাখি আকারে প্রায় একটি শালিকের সমান। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির সবুজ, হলুদ ও বাদামিসহ কয়েক রঙের পালক থাকে। চোখের ব্যান্ড কালো যা ঠোঁটের গোড়া থেকে প্রায় ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত।
সৌরভ মাহমুদ, প্রকৃতিবিষয়ক লেখক