শরতে সুদর্শন বিচিত্রা কেঁউ
শরত এলে প্রকৃতি অন্য রকম সুন্দর হয়ে ওঠে। গত ২৮ ভাদ্র, শরতের এমন একটি দিন যেন স্বপ্নের মতো কাটালাম আমরা সাতজন। গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। জিন্দা পার্ক পেরিয়ে গ্রামের আরও ভেতরে যেতে চোখে পড়ল রাস্তার দুই ধারে পদ্ম ও শাপলা ফুল ফোটা বিলগুলো। যেন ছবির মতো দৃশ্য। সকালটা সেখানে কাটিয়ে কাশবন ঘুরে দুপুর নাগাদ ফিরে এলাম জিন্দা পার্কে। পার্কে ঢুকেই রেস্তোরাঁর সামনে দেখা পেলাম এক সুদর্শন উদ্ভিদের।
বিচিত্র রঙের বাহারি পাতা, কাণ্ডের শীর্ষে একটা আঁটসাঁট লাল মঞ্জরিতে ফুটে আছে সাদা ফুল। চিনতে মোটেও কষ্ট হয় না। ফুল ও পাতা দেখে চিনে ফেললাম কেমুক বা কেঁউগাছকে। এ দেশের বন–জঙ্গল, নালা ও ডোবার ধারে এই গাছ বেশ দেখা যায়। বুনো গাছ, আগাছার মতো জন্মে। তবে শরতে সেসব ঝোপালো গাছের মাথায় সাদা ফুলগুলোকে দূর থেকে দেখে ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয় যেন ডানা ভাঁজ করে সাদা সাদা পরি শিশু বসে আছে; এ গাছেও সে রকম ফুল।
শরতের মাঝামাঝি, মঞ্জরি দেখে মনে হলো সে গাছে আরও আগে থেকেই ফুল ফুটছে। আমরা হয়তো শেষ দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। ফুলের চেয়ে মুকুটের মতো ফুলখসা শক্ত বৃতিগুলোও কম সুন্দর নয়। বুনো কেঁউগাছের ফুল ও মঞ্জরি সুন্দর, তবে বিচিত্রা কেঁউগাছের সবই সুন্দর। বিশেষ করে কাণ্ডের ওপর সজ্জিত বর্ণিল পাতাগুলোর বাহার দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবেন।
বুনো কেঁউ ও বিচিত্রা কেঁউ দুটিই একই প্রজাতি ও গোত্রের। বুনো কেঁউ জন্মে প্রাকৃতিকভাবে বনজঙ্গলে। বিচিত্রা কেঁউ জন্মে লালিত বা রোপিত হয়ে বাগান ও উদ্যানে। এ দুটি গাছ সহজে চেনার উপায় হলো ওগুলোর পাতা। বুনো কেঁউয়ের পাতা একহারা সবুজ। বিচিত্রা কেঁউয়ের পাতা নানা রঙে চিত্রিত। বিচিত্রা কেঁউগাছের পাতাগুলোর দৃষ্টিনন্দন বর্ণ ও সজ্জার জন্য এটি আলংকারিক উদ্ভিদের মর্যাদা পেয়েছে। বিচিত্র কেঁউয়ের কাণ্ডÐলালচে মেরুন রঙের বেতের মতো, যা ওপরের দিকে একটি বিশেষ সর্পিলাকার বা আঁকাবাঁকা বিন্যাসে প্যাঁচানো থাকে। পাতা সরল, লম্বাটে-আয়তাকার। অগ্রভাগ সরু। ফলকের কিনারা অখণ্ডিত ও মসৃণ, চকচকে সবুজ, যার কিনারা ও ফলক ঘিয়ে সাদা-সবুজ রঙের রেখা দ্বারা চিত্রিত। পাতার নিচের পিঠ নরম ও সূক্ষ্ম রোমে ঢাকা। গাছের উচ্চতা প্রায় দুই মিটার। উজ্জ্বল লাল রঙের মোচাকৃতির শীর্ষমুকুল বা প্রান্তীয় কৌণিক শম্বুকাকার মঞ্জরিতে কুঁচকানো টিস্যু পেপারের মতো সাদা রঙের চোঙা আকৃতির ফুল ফোটে, যার কেন্দ্রভাগ থাকে হলুদ। ফুল উভলিঙ্গী। ফোটা ফুলের পাপড়ির ব্যাস বা বিস্তার প্রায় আট সেন্টিমিটার। ফোটা ফুল এক-দুই দিন স্থায়ী হয়। ফুল খাওয়া যায়। ফল লাল বা বাদামি, ক্যাপসুল ধরনের।
বৈচিত্র্যময় পাতার কারণেই এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম রাখা হয়েছে Hellenia speciosa ‘Variegatus’ Syn. Cheilocostus speciosusÔ‘Variegatus’, গোত্র কোস্টেসি। পাতাগুলোর সর্পিল বিন্যাসের কারণে এর ইংরেজি নাম হয়েছে ‘ভেরিগেটেড স্পাইরাল জিঞ্জার’। আদাগোত্রীয় উদ্ভিদ না হয়েও একে আদা বলা হয় এর আদার মতো মূলের কারণে। আদার মতো কেঁউকন্দের আছে দারুণ উপকারিতা। গ্রামের মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই এই গাছের কন্দ (শিকড়), পাতা ও ফুল বিভিন্ন লৌকিক উপায়ে ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে শিশুদের পেটে গুঁড়া কৃমির উপদ্রব হলে গ্রামে অনেকে এ গাছের মূল বা কন্দ বেটে তার রস শিশুকে সকাল-বিকেল খাওয়ান। জ্বর, হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসকষ্টের সমস্যা দূর করতে এর কন্দের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। গায়ে চুলকানি, পাঁচড়া বা একজিমা হলে কেমুকের মূল বেটে তার রস ত্বকে লাগানো হয়। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, এটির নিয়মিত ব্যবহারে শরীরের শ্বেতী রোগ বা সাদা দাগের প্রকোপ কমে। তবে এসব ঔষধি গুণ আছে বুনো কেঁউগাছের। ধারণা করা যায়, বিচিত্রা কেঁউগাছের কন্দেরও সেরূপ ঔষধি গুণ আছে। তাই এ গাছের ঔষধি গুণ নিয়ে আরও গবেষণা হতে পারে।
বিচিত্রা কেঁউ বাড়ি, বাগান ও উদ্যানের ভূদৃশ্য রচনা বা ল্যান্ডস্কেপিংয়ের জন্য একটি চমৎকার গাছ। বিশেষ করে বাগানের প্রবেশপথে, আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে এরূপ স্থান অথবা দৃষ্টিকটু এলাকাকে আড়াল করার জন্য নিচু বেড়ার মতো এ গাছ ব্যবহার করা যায়। আধো ছায়া জায়গায় এ গাছ ভালো জন্মে। এর মোথা বা কন্দ চিরে ভাগ করে লাগালে তা থেকে নতুন গাছ জন্মে। বুনো কেঁউগাছের চেয়ে বিচিত্রা কেঁউগাছের বৃদ্ধি কিছুটা মন্থর।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক