বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি বিবিসির ইজারা বাতিল করে বন সংরক্ষণের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তা না মেনে ভিন্ন মৌজা দেখিয়ে একই মালিকের অন্য প্রতিষ্ঠান কোহিনুর স্টিলকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের ইজারার পর এ বছরের আগস্টে পরিবেশগত ছাড়পত্র পায় প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সেখানে উপকূলীয় বন বিভাগের ১৫০ একর কেওড়াবাগান রয়েছে। এটি বন আইনের ৪ ধারায় সংরক্ষিত বনের তালিকাভুক্ত। ছাড়পত্র দেওয়ার আগে বন বিভাগের কোনো পরামর্শ নেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর।

গত ৩১ অক্টোবর উপকূলীয় বন বিভাগ পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে। এতে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাসহ বনাঞ্চল থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় ওই এলাকায় জাহাজভাঙা কারখানা হলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে।

উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেখানে ৪৫ ফুট উচ্চতার কেওড়াবাগান রয়েছে। এ অবস্থায় পরিবেশগত ছাড়পত্র কীভাবে দিল, তা বোধগম্য নয়। আমাদের অবহিত করলে ভালো হতো। আমরা ছাড়পত্র বাতিলের আবেদন করেছি।’

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে জায়গা এখন ইজারা পেয়েছে, সেখানে নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, জানা নেই। আমরা ডিসি অফিসের ইজারার কাগজপত্র দেখে ছাড়পত্র দিয়েছি। ইয়ার্ডের জায়গায় গাছপালা নেই। তবে এর বেশি দখল করে বনের দিকে গেছে কি না, সেটা জানি না।’

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, কোহিনুর স্টিলের মালিক আবুল কাশেমের লোকজন পুরো এলাকাটি পাহারা দিচ্ছে। তাঁরা জাহাজভাঙা কারখানার জন্য বেশ কিছু কেওড়াগাছসহ এলাকাটিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছেন।

কোহিনুর স্টিলের মালিক আবুল কাশেমের দাবি, নিয়ম মেনে সব করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছি। ইয়ার্ডে এখন ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। দোতলার ছাদ ঢালাইসহ কিছু কাজ বাকি আছে। সেখানে আমি ঝাউবাগানও করব।’

তবে পরিবেশবিদেরা জানান, কারখানাসহ সবকিছু প্রস্তুত হলেই কেবল পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া যায়। নির্মাণের সময় অবস্থানগত ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু প্রস্তুত হওয়ার আগেই দুটি ছাড়পত্র পেয়েছে কোহিনুর স্টিল।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি ভূমি উন্নয়ন করেছে। অন্য শর্তগুলো পূরণ করবে আস্তে আস্তে। তাই ছাড়পত্র পেয়েছে।

চলছে ইজারা বাতিলের লড়াই

বনভূমি ইজারার বিরুদ্ধে উপকূলীয় বন বিভাগ তাদের আইনি ও প্রশাসনিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিলের আবেদনের আগে ২ অক্টোবর ইজারা বাতিল করতেও চিঠি দিয়েছিল উপকূলীয় বন বিভাগ।

এতে তিন বছর আগে বিবিসি স্টিলকে যে বনভূমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল, কোহিনুর স্টিলকে দেওয়া ভূমিও একই স্থানে বলে উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে গত ২৩ অক্টোবর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের উপস্থিতিতে সভা হয়। কিন্তু দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে।

নতুন করে বনের জায়গা ইজারা দেওয়ায় গত ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, কোহিনুর স্টিলসহ বিভিন্ন পক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বেলা। জানতে চাইলে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, এটা পরিবেশ-বিধ্বংসী ইজারা। এর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন প্রক্রিয়াধীন।