রং বদলানো দুই ফুল
আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা উদ্ভিদজগতে প্রতিমুহূর্তে নানান অদৃশ্য পরিবর্তন ঘটছে। প্রাকৃতিক নিয়মে পুরোনো পাতা ঝরে, আবার নতুন পাতা গজায়। আপন নিয়মেই ফুল ফোটে গাছে। ফুল শেষে ফল আসে। আপাত বিশৃঙ্খল মনে হলেও তরুজগতের প্রতিদিনের এসব কর্মকাণ্ড অনেকটাই রীতিবদ্ধ; কিন্তু একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে উদ্ভিদজগতে কিছু ব্যতিক্রমও চোখে পড়বে। অবশ্য আমাদের কাছে ব্যতিক্রম মনে হলেও প্রকৃতিতে তা নিয়মের মধ্যেই পড়ে। যার একটিÑফুলের রং বদলানো স্বভাব। রঙের এমন বৈপরীত্য আমাদের কিছুটা বিভ্রান্ত করে বৈকি! তবে এটা একধরনের কৌশল কিংবা প্রকৃতির মজা। ফুল ফোটার সময় সতেজ অবস্থায় থাকে এক রং, সময় একটু গড়ালেই আগের রংটা বদলে যেতে থাকে। তখন আবার দেখতে আরেক রকম। অনেকেই মনে করেন, একই গাছে দুই রঙের ফুল ফুটেছে। এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিও আছে। আসলে তা নয়। আমাদের চারপাশে এমন ব্যতিক্রমী কিছু ফুল ফোটে, যার মধ্যে উলটচণ্ডাল ও ব্রুনফেলসিয়া অন্যতম।
উলটচণ্ডাল শালবনসহ অন্যান্য বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও ব্রুনফেলসিয়া আবাদিত। দুটি ফুলই দেখতে বেশ সুদর্শন। উলটচণ্ডাল লতানো উদ্ভিদ হলেও ব্রুনফেলসিয়া গুল্মশ্রেণির গাছ। এই ফুল সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত। রং বদলানো এই দুটি ফুল সম্পর্কে জানা যাক।
উলটচণ্ডাল
বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকা ক্লাবের প্রধান ফটকের পাশে ফুলটি দেখে ভেবেছিলাম, ভিনদেশি! কিন্তু বইপুস্তক ঘেঁটে দেখি, গাছটির আদি আবাস বাংলাদেশ ও ভারত। দেশের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো স্থানের মধ্যে ঢাকার কথাও আছে। কয়েক বছর আগে বর্ষাকালের মাঝামাঝি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগায় শালবনের ভেতর রূপসী এই ফুলের দেখা পাই। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উলটচণ্ডালের ফুল প্রথম দেখার এই অভিজ্ঞতা সত্যিই চমকপ্রদ। মধুপুর বন ও উপকূলীয় অঞ্চলেও এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। বর্তমানে গাছটির প্রাকৃতিক আবাস অরক্ষিত। আমাদের দেশে এমন অনেক উদ্ভিদই প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে নগর উদ্যানে আশ্রয় নিয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে স্বল্পতার কারণে কেউ কেউ এ উদ্ভিদকে আবার ভিনদেশিও ভাবতে শুরু করেছেন।
উলটচণ্ডাল (Gloriosa superba) সংক্ষিপ্ততম সময়ের অতিথি হয়ে আসে আমাদের প্রকৃতিতে। ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বাগান, বলধা গার্ডেনসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে চোখে পড়ে। গাছটি চমৎকার ঔষধি গুণের জন্য ব্যাপক আদৃত।
উলটচণ্ডাল লতানো গাছ, পাতার আগা আকর্ষীতে রূপান্তরিত, তা দিয়েই আশ্রয়ে বেয়ে ওঠে। পাতা লম্বা, বোঁটাহীন, বিন্যাস বিপ্রতীপ। ফুল গ্রীষ্মের শেষে ও বর্ষায় ফোটে এক বা একাধিক। গন্ধহীন, প্রথমে হলুদ, পরে পাপড়ির রং কমলা বা লালচে হয়ে ওঠে। পাপড়ি ওপরের দিকে ওলটানো, কিনারা কুঁচকানো, ছয় সেন্টিমিটার লম্বা। গাছ শরতে শুকিয়ে শীতে মরে যায়, গ্রীষ্মে আবার গুচ্ছমূল থেকে নতুন চারা গজায়। গাছটি বর্তমানে বিপন্ন।
ব্রুনফেলসিয়া
ফুলটির কোনো বাংলা নাম নেই। ইংরেজিতে ইয়েস্টার্ডে, টুডে ও টুমরো নামে পরিচিত। অবাধ প্রস্ফুটন, বর্ণবৈচিত্র্য ও স্নিগ্ধ সৌরভের কারণে ইতিমধ্যে সবার মন জয় করেছে। এ কারণে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ইদানীং সব ধরনের বাগান ও পথপাশে, এমনকি টবেও শোভা পাচ্ছে এই ফুল। এ গাছের সতেজ ফুলের রং বেগুনি, বাসি ফুল কয়েক দিনের ব্যবধানে সাদা রং ধারণ করে। একই সঙ্গে দুই রঙের ফুলই অনেক দিন সতেজ থাকে।
ব্রুনফেলসিয়া (Brunfelsia calycina) দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল থেকে আমাদের দেশে এসেছে অনেক আগেই। অসংখ্য ডালপালায় ঝোপাল এই গাছ এক থেকে দুই মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। মসৃণ ও গাঢ় সবুজ রঙের পাতাগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। শীতের শেষভাগে গাছের সব পাতা ঝরে যায়। গ্রীষ্মে প্রায় পাতাহীন গাছে অজস্র বেগুনি রঙের ফুল ফোটে। ফুল আড়াই থেকে তিন সেন্টিমিটার চওড়া। একই গাছে দুই রঙের ফুল দেখে এই গাছ খুব সহজেই চেনা যায়। এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে কেউ কেউ এই গাছকে ‘সুষমা’ নামেও ডাকেন। গ্রীষ্ম থেকে শরৎকাল পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস গাছে প্রস্ফুটন প্রাচুর্য অব্যাহত থাকে। গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাসে এই ফুলের মধুরিমা সুবাস ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর অবধি।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক