হারিয়ে যেতে বসা গাছের ঠিকানা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে বর্তমানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলছে। আমাদের ইচ্ছা, ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন বন, বিশেষ করে মধুপুর, ভাওয়াল ও শেরপুরের শালবনের দেশীয় বৃক্ষ প্রজাতির অন্তত একটি করে গাছ যেন এখানে থাকে। এতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসব বৃক্ষকে সরাসরি দেখে চিনতে পারবে, শিক্ষা ও গবেষণায় কাজে লাগাতে পারবে।
এই ভাবনা থেকেই মল চত্বরে প্রায় ১২০ প্রজাতির দেশীয় বিপন্ন বৃক্ষরোপণ করেছি। উদ্যোগটির নাম দিয়েছি ‘বাংলাওয়াকি’। জাপানের মিয়াওয়াকি পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত এই উদ্যোগ মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিপন্ন বৃক্ষ প্রজাতির একটি নিবিড় সংরক্ষণবাগান। আমাদের লক্ষ্য, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপন্ন বৃক্ষকে একটি ছোট পরিসরে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা তৈরি করা।
বাংলাওয়াকিকে আরও সমৃদ্ধ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপন্ন বৃক্ষের চারা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছি। এর অংশ হিসেবে গত মাসের (জুলাই) ২৫ তারিখ চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়।
ফজরের নামাজের পর ভোর পাঁচটায় একজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হই। প্রায় ১১টার দিকে ষোলশহরের বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের নার্সারিতে পৌঁছাই। সেখান থেকে প্রায় ৩০ প্রজাতির বিপন্ন দেশীয় বৃক্ষের চারা সংগ্রহ করি। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. হাসিনা মরিয়ম আমাদের আন্তরিক সহযোগিতা করেন। বিএফআরআই কর্তৃপক্ষ কোনো রাজস্ব মূল্য গ্রহণ না করে চারাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার হিসেবে দেয়। তাদের প্রতি আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
এরপর আমাদের গন্তব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট। এবারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চকায় ও আইকনিক বৃক্ষ বৈলামকে সরাসরি দেখা এবং এর সঠিক পরিচিতি জানা। সেখানকার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আক্তার হোসেনের সহযোগিতায় বৈলামসহ আরও কয়েকটি বিপন্ন বৃক্ষ প্রজাতির চারা সংগ্রহ করি।
ঢাকায় বৈলামের চারা সহজে পাওয়া যায় না। তাই আমরা ২০টির বেশি বৈলামের চারা সংগ্রহ করি। সেখানে আগে থেকেই রোপণ করা বিশাল একটি বৈলামগাছ দেখে সত্যিই অভিভূত হলাম। আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি বৃক্ষ এত উঁচু হতে পারে, নিজ চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। অধ্যাপক আক্তারের সহযোগিতায় সেই গাছের সঙ্গে কয়েকটি ছবিও তুলে রাখলাম।
সময় ছিল অল্প। একই দিন ঢাকায় ফিরতে হবে। তাই দীর্ঘ সময় অবস্থান না করে ভাটিয়ারীর পাহাড়ি পথ ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফিরে আসি। পথে ভাটিয়ারীতে কিছুক্ষণ বিরতি নিই। পাহাড়, লেক আর সবুজের সমারোহে জায়গাটি মনকে প্রশান্ত করল। সেখান থেকে কিছু বন্য শাকসবজি ও ফল কিনে আবার যাত্রা শুরু করি।
সেদিনের আকাশ ছিল নির্মল। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। বিকেল পাঁচটার দিকে চৌদ্দগ্রামে যাত্রাবিরতি দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিই। রাত প্রায় নয়টার দিকে ঢাকায় ফিরে আসি।
ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য আমরা সফলভাবে অর্জন করেছি। সংগ্রহ করা চারাগুলো এখন বাংলাওয়াকির অংশ হবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য শুধু কিছু গাছ রোপণ করা নয়। আমরা চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের দেশীয় ও বিপন্ন বৃক্ষগুলোকে সরাসরি চিনুক, তাদের বৈশিষ্ট্য জানুক এবং গবেষণার কাজে ব্যবহার করুক।
আমরা এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষশুমারি সম্পন্ন করেছি। সেখানে ২৭৭ প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশই বিদেশি প্রজাতির। আমাদের স্বপ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস একদিন দেশীয় বৃক্ষের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ মানুষ এখানে এসে বাংলাদেশের বৃক্ষঐতিহ্যকে চিনতে পারবে।
বাংলাওয়াকি সেই স্বপ্নেরই সূচনা। আমাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় বৃক্ষগুলোর অন্তত একটি করে চারা সেখানে রাখা। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি করে দেশীয় বিপন্ন বৃক্ষবাগান গড়ে উঠতে পারে। শিক্ষা, গবেষণা ও সংরক্ষণ—তিনটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার এ উদ্যোগ একদিন দেশের হারিয়ে যেতে বসা বৃক্ষ ঐতিহ্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়