জীবনানন্দ দাশের নাটাফলের সাক্ষাৎ যে সমুদ্রতটেই ঘটবে, সেটা আগে জানা ছিল না। কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফ যাওয়ার পথে কিছুক্ষণের জন্য পদুয়ারটেক থামি। দুপুরের খাবারটা সেখানেই সারতে হলো। খাওয়ার পর প্রশস্ত বালিয়াড়িতে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি।
সেখানে মানুষের ভিড় নেই। কোলাহল নেই। যথারীতি একঝাঁক সাগরলতার ফুল চোখে প্রশান্তি এনে দেয়। সাগরপাড়ে এই ফুলের কোনো কমতি নেই। সারা বছরই ফোটে। প্রস্ফুটন প্রাচুর্যেও অনন্য। খানিকটা ঘুরে আবার মূল সড়কে উঠতে গিয়েই চোখে পড়ল সাগরনিশিন্দা। গাছগুলো তুলনামূলকভাবে খাটো। কিন্তু পুষ্পপ্লাবনে আলোঝলমল করে রেখেছে চারপাশ। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি রীতিমতো সাগরনিশিন্দার বন যেন!
সড়ক পেরিয়ে পুনরায় রেস্তোরাঁটির সামনে ফিরে আসি। তখনই চোখ আটকে যায় পাশাপাশি থাকা দুই রঙের ফুল দুটির ওপর। সাদা ও বেগুনি রঙের অপরাজিতা। তবে আমাদের চারপাশে সচরাচর দেখতে পাওয়া তেমন অপরাজিতা নয়। গড়নে ভিন্ন, আকারেও কিছুটা বড়। রংটাও তত জম্পেশ নয়! ফ্যাকাশে ধরনের। নতুন অবয়বের এই অপরাজিতা দেখার মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে কয়েকটি ছবি তুলে রাখি।
এবার কক্সবাজার শহরে ফেরার পালা। একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে পাহাড়, বিক্ষিপ্ত জনপদ। পাহাড় লাগোয়া সুদৃশ্য সুপারির বন মনোমুগ্ধকর। দুপুর গড়িয়ে শীতের বিকেল নামছে দ্রুত। গাছের মাথায়, পাহাড়ের কোলে বিষণ্ন আলো জমতে শুরু করেছে। পথের দুই পাশে দেশি গাছের সমারোহ স্বস্তিদায়ক। পলাশগাছের এমন বিপুল উপস্থিতি দেশের আর কোথাও চোখে পড়েনি।
কিছু কিছু সোনালুও দেখা গেল। তবে গাছগুলোকে নিতান্তই অভিভাবকহীন মনে হলো। অনেকগুলো পলাশগাছের ডালপালা কাটা হয়েছে। কোনো কোনোটির মাথা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! কারা এসব করেছে, কেন করেছে তা কি কারও জানা আছে? কেউ কি এসবের খবর রাখেন? অথচ কত যত্ন করে, শ্রম আর অর্থের বিনিময়ে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল।
পলাশ নিয়ে দুঃখের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে মন যখন বিক্ষিপ্ত, তখন পঞ্চেন্দ্রিয় জানান দিল, পথের ধারে ছড়িয়ে আছে মুক্তা রাশি রাশি! চালককে গাড়ি থামাতে বলি। গাড়ি থেকে নেমে খানিকটা পেছনে আসি। তখনই চোখে পড়ে নাটাগাছের ঝোপগুলো। একটি-দুটি নয়, রাশি রাশি। অখ্যাত এই বুনোফলকে বিখ্যাত করে তুলেছেন স্বয়ং জীবনানন্দ দাশ। রূপসী বাংলায় তিনি লিখেছেনÑ
‘...পাড়াগাঁর কিশোরেরা যখন কান্তারে/ বেতের নরম ফল, নাটাফল খেতে আসে, ধুন্দুল বীজের/ খোঁজ করে ঘাসে ঘাসে...’। অন্যত্র আছে—
‘...একদিন নক্ষত্রের তলে/ কয়েকটা নাটাফল তুলে নিয়ে আনারসী শাড়ির আঁচলে/ ফিঙার মতন তুমি লঘু চোখে চলে যাও জীবনের কাজে’।
আহা, আনারসী শাড়ির আঁচলে তুলে নিয়ে যাওয়া সেই নাটাফল। এখানে কত অনাদরে জন্মেছে। বেড়ে উঠছে। যেন আমাদের কত যুগযুগান্তরের চেনা। জীবনানন্দ দাশের হাত ধরেই গাছটি আমাদের পরম আত্মীয় হয়ে উঠেছে।
নাটাফলের গাছ (Caesalpinia bonduc) বড়সড় আরোহী বা গুল্ম ধরনের, ৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, শাখায় সোজা এবং বাঁকানো কাঁটা আছে। পাতা যৌগিক। পত্রকোণে মঞ্জরি হয়। ফুল হলুদ বর্ণের। ফল শিমের মতো। মার্চ মাসে ফল পাকে। বীজ কৃমিনাশক। বীজ থেকে চারা। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সহজলভ্য।
প্রসঙ্গত, এখানে সাগরলতা ও সাগরনিশিন্দার সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও আবশ্যক। সাগরলতা (Ipomoea pes-caprae) দ্রুত বর্ধনশীল ও লম্বাটে হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাতা একক, পুরু, মসৃণ ও দেড় মিলিমিটার লম্বা। ফুল সাধারণত একক, ফোটে পাতার কক্ষে, বেগুনি রং, ফানেল আকৃতির এবং ৩ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার দীর্ঘ। গাছ চমৎকার ঔষধিগুণসম্পন্ন। পাতা ও শিকড় দুর্বলতা কাটাতে, আর্থাইটিসে, বাতব্যথায় এবং কোথাও কোথাও ডায়াবেটিসের প্রতিষেধক হিসেবেও ব্যবহার্য।
সাগরনিশিন্দার (Vitex trifolia) পাতা সাধারণ নিশিন্দার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড়, আয়তাকার এবং গাঢ়-সবুজ। ফুলের রং গাঢ়-বেগুনি, ফোটে পর্যায়ক্রমে, শীতে কম থাকে। পাতা ও শিকড়ের রস বাতব্যথাসহ নানা রোগের মহৌষধ। সাগরনিশিন্দার আরেক নাম নীল নিশিন্দা। প্রাচীন রাজনিঘণ্টুতেও এ গাছের উল্লেখ রয়েছে।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক