জগদীশপুরের তেঁতুলগাছ
যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেছে। প্রতাপশালী জমিদারের পতন ঘটেছে। বুড়ি ভৈরব নদের স্রোতস্বিনী প্রবাহ হারিয়ে গেছে। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের বিশাল তিনটি তেঁতুলগাছ।
যশোর শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ছায়াসুনিবিড় জগদীশপুর গ্রাম। সম্প্রতি গিয়েছিলাম সেই গ্রামের গাছগুলো দেখতে। যশোর-চৌগাছা সড়ক দিয়ে আমাদের বাইক ছুটে চলেছে। মুক্তাদাহ থেকে জগদীশপুর মিয়াবাড়ি পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার সড়কের দুই ধারে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আম-কাঁঠাল আর লিচুর বাগান। রাস্তার দুই ধারের বাড়িঘর প্রায় নেই বললেই চলে। এই সড়ক ধরে জগদীশপুর গ্রামে যাওয়ার সময় প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে মনটা ভালো হয়ে যায়।
মিয়াবাড়ির সামনে যখন পৌঁছালাম, তখন ভরদুপুর। কাঠফাটা রৌদ্দুর। ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। কিন্তু প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছের তলায় দাঁড়াতেই ঝিরঝির বাতাসে শরীর-মন জুড়িয়ে গেল!
গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য গোড়া বাঁধাই করা বেঞ্চে বসে অসংখ্য মানুষ শীতল হচ্ছেন। গাছের ডালে ডালে শালিক, চড়ুই, ঘুঘু পাখির কিচিরমিচির ডাক। পাখির বিষ্ঠা যাতে তলায় বিশ্রাম নেওয়া মানুষের গায়ে না পড়ে, এ জন্য ওপরে টিনের ছাউনি দেওয়া আছে।
এই গাছতলায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন জগদীশপুর গ্রামের ৯২ বছর বয়সী সরোয়ার হাওলাদার। তেঁতুলগাছ ঘিরে তাঁর শৈশবের অনেক মধুর স্মৃতি রয়েছে।
সরোয়ার হাওলাদার স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘জন্মের পর থেকে দেখছি, এই তেঁতুলগাছগুলো একই রকম। আমার বাবা-দাদারাও এই তেঁতুলগাছ একই রকম দেখেছেন। ছোটবেলায় প্রায় সারা দিনই এই তেঁতুলগাছের ডালে ডালে থাকতাম। আমি, আমার বন্ধু বরকত ও সাখাওয়াত মিলে প্রায়ই তেঁতুল পাড়তাম। ওই তেঁতুল বাড়িতে নিয়ে খেজুরের গুড়ে ভিজিয়ে রাখতাম। পরে সেই গুড়ে ভেজানো তেঁতুল হাতে নিয়ে গ্রাম ঘুরে খেয়ে বেড়াতাম। সে একটা সময় ছিল। এখন বয়স হয়েছে, তেঁতুলগাছের ছায়ায় বসে থাকি। প্রতিদিন দুপুরে তীব্র রোদের সময় আমরা এখানে বসে গল্পগুজব করি।’
এই গাছের পাশেই মসজিদ। ওই মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা তেঁতুলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গল্প–আড্ডায় মিলিত হন। এ ছাড়া পথচারীরাও বসে বিশ্রাম নেন।
পাশেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে আরেকটি প্রাচীন তেঁতুলগাছ রয়েছে। সেই গাছের নিচেও মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে রয়েছে চায়ের দোকান। ওই তেঁতুলগাছের তলায় বসে মানুষ চা পান করতে করতে আড্ডা–গল্পে মেতে ওঠেন।
এই দুটি তেঁতুলগাছ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরত্বে আরেকটি বড় তেঁতুলগাছ রয়েছে। ওই গাছের তলায় বসে বিশ্রাম নেওয়া গ্রামের মানুষেরা কখনো মেপে দেখেননি গাছের উচ্চতা ও বেড় কত ফুট। গাছের তলায় পৌঁছে গাছের উচ্চতা ও বেড় কত জানতে চাইলে তড়িঘড়ি করে দুজন পাশের দোকান থেকে রশি এনে মাপা শুরু করলেন।
৭০ বছর বয়সী ওলিয়ার রহমান বলেন, ‘গাছটির বয়স কত বছর তা ঠিক বলতে পারব না, তবে আমার বাবা–দাদাও এই গাছটি এমনই দেখেছেন। যখন গাছে তেঁতুল ধরে, তখন গ্রামের লোকজন যে যার মতো পেড়ে খেতে পারে। এই গাছের মালিক কোনো একক ব্যক্তি নন। গত বছর ৪০ থেকে ৫০ মণ তেঁতুল হয়েছিল এই একটি গাছে।’
তেঁতুলগাছগুলোর বয়সের বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়াবাড়ির সদস্য আ ন ম মোস্তাদুদ দস্তগীর (৫৭) প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে এক ইতালীয় উদ্ভিদবিশেষজ্ঞ এ এলাকায় এসেছিলেন। কৌতূহলবশত তিনি গাছগুলোর বয়স নির্ধারণের জন্য কার্বন পরীক্ষার সাহায্য নেন। সেই পরীক্ষায় তখন গাছগুলোর বয়স ৬৩০ বছর বলে জানা যায়। কালের বিবর্তনে ডালপালায় কিছুটা পরিবর্তনের ছাপ থাকলেও গাছগুলো আজও সবুজ–শ্যামল রয়েছে।
গ্রামটির নামকরণের ইতিহাসের বিষয়ে ৮০ বছর বয়সী শের আলী বলেন, ‘আমরা মুরব্বিদের কাছে শুনেছি, সাড়ে ছয় শ বছর আগে বুড়ি ভৈরব নদের বুক চিরে জেগে ওঠা চরে জগদীশ ঘোষ নামের এক ব্যক্তি প্রথম এ এলাকায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন। সেই জনপদই আজ জগদীশপুর গ্রাম।
মিয়াবাড়ির সামনে জমিদার ভবনের একটি ফটক রয়েছে। ওই ফটকে লেখা রয়েছে, জমিদার ভবন। মিয়াবাড়ি-জগদীশপুর এস্টেট। স্থাপিত বাংলা ১৩১৪ সন ইংরেজি ১৯০৬ সাল। চুন–সুরকি দিয়ে নির্মিত এই ভবনের একাংশ এখনো রয়েছে।
এই গাছগুলো এখন শুধু প্রাচীন বৃক্ষ নয়, বরং জগদীশপুরের মানুষের প্রধান মিলনস্থল। প্রতিদিন বিকেলে বয়োজ্যেষ্ঠদের গল্পের আসর কিংবা তরুণদের আড্ডা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই গাছের তলা। এখানে বসলে মনে হয়, গাছগুলো যেন তাদের পাতার মর্মর ধ্বনিতে কয়েক শতাব্দীর পুরোনো গল্প শোনাচ্ছে।